রবিবার, এপ্রিল ৩০, ২০১৭

গোয়েন্দা রিপোর্টেই ভাগ্য নির্ধারিত হবে ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির

কিম সেনগুপ্তা

নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের বিজয় অর্জনের পেছনে মূল ভূমিকায় ছিল গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী এই প্রেসিডেন্টকে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে তারাই হতে পারে অন্যতম। যদি জেমস কমি শেষ মুহূর্তের কাজটি না করতেন তাহলে হয়তো হোয়াইট হাউসে এখন দেখা যেত হিলারি ক্লিনটনকে। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকতে এফবিআই পরিচালক জেমস কমি যখন ঘোষণা দিলেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ব্যবহৃত ই-মেইলের অনুসন্ধান আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে, তখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন হিলারি।
এর অল্প কয়েকদিন পরেই জেমস কমি ঘোষণা দিলেন হিলারির বিরুদ্ধে কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি। কিন্তু ততক্ষণে তার ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। তার প্রচারণার গতি পাল্টে গেছে। অন্যদিকে শক্তিশালী হচ্ছিলেন ট্রাম্প। এক্ষেত্রে ডেমোক্রেটিক দলের প্রচারণার সঙ্গে কার্যকর সাবোটাজ করেছেন জেম কমি। প্রমাণসহ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাশিয়া কানেকশনের অভিযোগ উঠেছিল। তা তদন্তের দাবি উঠেছিল। কিন্তু তিনি তা না করে ট্রাম্পকে সহায়তা করেছেন।
আরো অভিযোগ আছে যে, হিলারি ক্লিনটনের বিষয়টি যখন সামনে তুলে ধরা হলো তখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্তকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে এফবিআই। ট্রাম্পের ক্রেমলিন কানেকশনের খবরটি ডেমোক্রেটদের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন বৃটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬-এর সাবেক কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার স্টিল। তার ফলে ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে এফবিআইয়ের কাছে যে নালিশ জানানো হলো তাতে দৃশ্যত কান পাতেনি তারা। উল্টো তারা যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে। ট্রাম্প প্রচারণা শিবিরের তখনকার সদস্য রুডি গিলিয়ানির সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এফবিআইয়ের কিছু এজেন্ট।
হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে পুনঃতদন্তের বোমশেল ঘোষণা দিলেন যেদিন জেমস কমি তার ঠিক দু’দিন আগে গিলিয়ানি বলেছিলেন, বিস্ময় অপেক্ষা করছে। আপনারা দু’জনে আগামী দু-একদিনের মধ্যে কিছু একটা শুনতে যাচ্ছেন, যা সবকিছুকে পাল্টে দিতে পারে। ওদিকে ট্রাম্প যে ‘মস্কোপন্থি প্রার্থী’ এমন অভিযোগও তিনি এড়িয়ে যেতে পারছিলেন না। তাই প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম ১০০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছে রাশিয়া। এ ইস্যুতে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বৈধতা নিয়েও মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির কম্পিউটারে সাইবার হামলা থেকে শুরু করে নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীর তহবিলে অর্থ দেয়ার পর্যন্ত অভিযোগ আছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মস্কো কানেকশন নিয়ে এখন তদন্ত করছে এফবিআই ও কংগ্রেস। বারবার টুইট করে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে তিনি নজর ভিন্নদিকে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। যেমন তিনি অভিযোগ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার ফোনে আড়ি পাতার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে তারা। কিন্তু তদন্ত চলছেই।
এখন গোয়েন্দাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরোধপূর্ণ একটি সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি সম্প্রতি সিআইএ সদর দপ্তর পরিদর্শন করেছেন। এ সময় আচরণ ও আরো কিছু বিষয়ে গোয়েন্দাদের অনেকের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছে। সিআইএ’র কাছে সম্মান জানানোর একটি স্থান হলো মেমোরিয়াল ওয়াল। তার সামনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প তার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া মানুষের সংখ্যা ও তার নিজের পাণ্ডিত্য নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, তারা বলছে ডনাল্ড ট্রাম্প কি একজন চৌকস ব্যক্তি? বিশ্বাস করুন, আমি একজন স্মার্ট ব্যক্তির মতো।
তার এ ধরনের বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিআইএ’র সাবেক পরিচালক জন ব্রেনান। একই সঙ্গে তিনি সিআইএ’র মেমোরিয়াল ওয়ালে গিয়ে নিজের আত্মপ্রচারকে তুলে ধরার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি। সিআইএ’র যেসব সদস্য বীরের মর্যাদা পেয়েছেন তাদের প্রতি সম্মান জানাতে তৈরি করা হয়েছে ওই মেমোরিয়াল ওয়াল। জন ব্রেনান বলেন, সেখানে যে কথা বলেছেন তার জন্য ট্রাম্পের নিজের কাছে নিজের লজ্জিত হওয়া উচিত।
ওদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সিনিয়র কয়েকজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মস্কোর হস্তক্ষেপের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাত্তিস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। আবার ক্রেমলিনের সঙ্গে রেক্স টিলারসনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এক্সোন মোবিলের সঙ্গে তিনি ৪০ বছর ধরে কাজ করছিলেন। এ সময়ে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এমনকি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি রোসনেফটের প্রকল্পে কাজ করেছেন তিনি। বলা হয়, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন রোনেফটের প্রধান ইগোর সেচিনের সঙ্গে তার রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ২০১৩ সালে তাকে অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ পুরস্কারে ভূষিত করে ক্রেমলিন। রাশিয়ার সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা একজন ব্যক্তি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হওয়ার যোগ্য কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিনেটর জন ম্যাককেইনসহ রিপাবলিকান সিনিয়র সদস্যরা। ইগোর সেচিনকে নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প টিমের সঙ্গে ক্রেমলিনের যেসব কর্মকর্তার সাক্ষাৎ হয়েছে তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এই টিমে আরো এমন কিছু লোক রয়েছেন যারা টিলারসনের চেয়ে বেশি নজরদারিতে থাকার কথা। তাদের মধ্যে রয়েছেন উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তা। যেমন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদচ্যুত লেফটেন্যান্ট মাইকেল ফ্লিন। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে তার চাকরি খতম। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত সের্গেই কিসলায়েকের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি তিনি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের কাছে মিথ্যাচার করেছিলেন। এ অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। কিন্তু পরে রিপোর্ট পাওয়া যায়, মস্কো সফরের সময় থেকেই তিনি রাশিয়ার কাছ থেকে অর্থ নেন। এ জন্য পেন্টাগনের তদন্তের মুখে ছিলেন। তিনি একটি বিদেশি এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। তাদের কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছিলেন। তখনো ক্ষমতায় বারাক ওবামা। তিনি যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করেন, সেদিনই পদত্যাগ করেন লেফটেন্যান্ট ফ্লিন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন। বিচার থেকে দায়মুক্তি পাওয়ার জন্য সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য বারবার প্রস্তাব দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফ্লিন। কিন্তু ওই কমিটি তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচনের আগে পদত্যাগ করেন ট্রাম্পের প্রচারণা বিষয়ক ম্যানেজার পল ম্যানাফোর্ট। ইউক্রেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট, ভ্লাদিমির পুতিনের একজন মিত্র ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ যে ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই কাজটিই তিনি করেছেন। উল্লেখ্য, ময়দান প্রতিবাদে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনে রয়েছেন রাশিয়ায়। ইউক্রেন সংক্রান্ত কাজের জন্য যে অর্থ নিয়েছেন তার জন্য ট্রাম্প টিম ছাড়তে হয়েছে ম্যানাফোর্টকে, যদিও তিনি এখনো পর্দার আড়ালে একজন প্রভাবশালী হিসেবেই রয়ে গেছেন।
ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের কাছ থেকে সন্দেহজনক বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন পল ম্যানাফোর্ট- এমন টাটকা অভিযোগ রয়েছে। কিয়েভের প্রসিকিউরেটররা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান। এজন্য তারা জেমস কমির সহযোগিতা চেয়েছেন। কিন্তু কেন সেই ম্যানাফোর্টের কাছ থেকে ট্রাম্প প্রশাসন দৃশ্যত দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে তা যদি প্রকাশিত হয় তাহলে তা হতে পারে নার্ভাসনেসের একটি বিষয়। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ব্রিফিংয়ের সময় মুখপাত্র শন স্পাইসার ম্যানাফোর্টের নাম ঘোষণা না করেই বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সীমিত ভূমিকা, খুব সীমিত সময় দিয়েছেন।
একই রকম ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে কার্টার পেজকে নিয়ে। তাকে তো ট্রাম্প পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেই ফেলেছিলেন। তার বিষয়ে শন স্পাইসার বলছেন, তিনিও নির্বাচনী প্রচারের সময় বড় কোনো অংশ ছিলেন না।
মিস্টার স্টিল ও অন্য যারা এফবিআইয়ের কাছে তথ্য সরবরাহ দিয়েছিলেন তাদের মতে, ক্রেমলিনের সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে হিলারি বিষয়ক যে গোয়েন্দা তথ্য আছে তা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন কার্টার পেজ। এছাড়া সেচিনের সঙ্গে মস্কোর বিরুদ্ধে দেয়া অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। অভিযোগ আছে, তিনি ২০১৩ সালে রাশিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভিক্টর পোডোবনির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। এ সময় তিনি পোডোবনিকে বিদ্যুৎশিল্প খাতের ডকুমেন্ট দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন।
বিদেশি শক্তির সন্দেহজনক এজেন্ট হিসেবে কার্টার পেজের ওপর নজরদারির জন্য ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিলেন্স অ্যাক্টের অধীনে একটি ওয়ারেন্ট হাতে পেয়েছে এফবিআই। তবে কার্টার পেজ দাবি করেছেন তার নাগরিক অধিকার এতে লঙ্ঘিত হয়েছে। তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। তদন্ত চলছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও। তার সমর্থকদের মাঝে এটা একটি ষড়যন্ত্র। তারা সতর্ক করছে রাষ্ট্রের গভীর থেকে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উৎখাতের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। একে তারা ক্যু বা অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
এরই মধ্যে ট্রাম্পের অনেক শত্রু আশা করছে, তারা যাকে পছন্দ করে না সেই প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের দিকে নিয়ে যাবে তদন্ত। তাই গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো তদন্তে সফল বা ব্যর্থ যা-ই হোন না কেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বা কয়েক মাসের মধ্যেও যদি তারা রিপোর্ট দেয় তাহলে তার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির পরিণতি।

(অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ।)

শেয়ার করুন

0 comments: