সোমবার, মে ০১, ২০১৭

আজও নারী ঘরের কাজের স্বীকৃতি পায়নি

দিলরুবা সুমী: 

গৃহ ব্যবস্থাপনার সব দায়িত্ব পালন করেও পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি আর যুগ যুগ ধরে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার কারণে আজও নারী ঘরের কাজের স্বীকৃতি পায়নি। আর এই স্বীকৃতি না থাকায় নারীরা অধিকার বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নির্যাতিত হচ্ছে। এ অবস্থার উত্তরণে প্রয়োজন নারীর ঘরের কাজের আর্থিক মূল্যায়ন ও মর্যাদা দেওয়া। নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশিষ্টজনরা এমন মতামতই গতকাল সকালের খবরের কাছে ব্যক্ত করেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহস্থালি ও সেবামূলক দৈনন্দিন কাজে একজন নারী দৈনিক গড়ে ১৮ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। ধানের বীজ উত্পাদন থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত মোট ২৩টি ধাপের ১৭টি কাজই করেন নারী। 

গবাদিপশু পালনসহ কৃষির বিভিন্ন খাতে নারীর অবদান প্রায় ৬৯ ভাগ। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এত কাজের সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা নেই। এটা নারী-পুরুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ও বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন নারীনেত্রীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, নারীর ঘরের কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নারীর ঘরের কাজের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া। নারীরাও এটিই চান। কারণ যখনই নারীর কাজের মর্যাদা দেওয়া হবে তখন তার কষ্ট উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। এতে নারীর প্রতি নির্যাতনও কমবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নারীর এই কাজের স্বীকৃতি আমাদের সমাজে দেওয়া হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পুরুষরা মনে করেন, নারীরা ঘরে যত কাজই করুক তার কোনো গুরুত্ব নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন অনেক পরিবারেই বিশেষ করে যেখানে নারীরা বাইরে কর্মরত, সেখানে অনেক পুরুষ ঘরের কাজে অংশগ্রহণ করেন। 

যতই পুরুষের এই অংশগ্রহণ বাড়বে ততই নতুন এক উপলব্ধি পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করবে। গৃহে নারীর ভূমিকা যে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় তা সবাই বুঝতে পারবেন। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, শত শত বছর ধরে সামাজিকীকরণের মধ্যে চলে আসছে যে, ঘরের কাজের দায়িত্ব নারীদের। কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে এবং পারিবারিক আর্থিক প্রয়োজনে নারীরা যখন বাইরে কাজ করতে যাচ্ছে তখনই ঘরের কাজে তাদের ভূমিকা সবার নজরে পড়ছে। কিন্তু এখনও বাইরে কর্মক্ষেত্রের জায়গাটা পুরুষের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। নারীরাও ঘরের কাজকে তাদের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করেন। সামাজিকভাবেও মনে করা হচ্ছে ঘরের কাজ কোনো কাজ নয়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে নারী ও পুরুষ উভয়েরই মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। ঘরের কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তিনি মনে করেন, ঘরে নারীর কাজকে সম্মান দিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে মর্যাদা দিতে হবে। এছাড়া নারীর ঘরের কাজের আর্থিক মূল্যায়ন করতে হলে গুণগত গবেষণা করতে হবে। সরকার থেকে এজন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফৌজিয়া মোসলেম সকালের খবরকে বলেন, ঘরের কাজকে নারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব এটিই আমাদের সমাজের সাধারণ ধারণা। তাই এ কাজে নারীর কোনো স্বীকৃতি যেমন নেই, তেমনই আর্থিক কোনো মূল্যায়নও নেই। তাই নারীরা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা তাদের কাজের সম্মানও পাচ্ছেন না। 

নারীরা সবসময় হীনমন্যতায় ভুগছেন। তাছাড়া টাকা উপার্জন করে বলে পুরুষরা একটা উচ্চ পর্যায়ে আছে বলে অনেকে মনে করেন। এ ধারণা থেকে নারীকে নির্যাতন করা হয়। যদি অর্থ উপার্জনের সঙ্গে নারীকে যুক্ত করা যায় তাহলে পুরুষের এই উচ্চতর স্তরে থাকার ধারণা ভেঙে যাবে। তখন নারী নির্যাতনও কমবে। এজন্য নারীদের ঘরের কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই নারীদের ঘরের কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও এটা করা প্রয়োজন। অনেকে মনে করেন, সন্তান লালন-পালনসহ অনেক কাজের মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কর্মজীবী মায়ের সন্তানকে ডে-কেয়ার সেন্টারে বা বাড়িতে লোক রেখে যত্ন নেওয়া হলে যে টাকা খরচ হবে সেটা হিসাব করে নারীর এ কাজের মূল্যও নির্ধারণ করা যায়। তেমনি তার সব কাজের হিসাব করা সম্ভব।

শেয়ার করুন

0 comments: