রবিবার, মে ০৭, ২০১৭

আমার ছেলেটা বড় হয়ে যেন একজন মানুষ মাশরাফি হয়

আমার ছেলেটা গতকাল রাতে একটুও ঘুমায়নি। খেলা শুরুর আগে যখন সে জানল ম্যাশ অবসরে যাচ্ছে তখন থেকেই চোখ মুখ অন্ধকার করে বসে আছে।বাংলাদেশের খেলা থাকলে আর সবার মতো আমার বাসাতেও ভালো মন্দ রান্না হয়।খেলা দেখা আর খাওয়া চলে।কিন্তু গতকাল খাবার তেমন কিছুই শেষ হয়নি।
রাত যখন একটা বাজে বললাম--- বাবা এখন কিছু খেয়ে চল ঘুমাই।সকালে স্কুলে যেতে হবে তো।লাল চোখে আমার দিকে একবার তাকিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ভ্যা করে কেঁদে ফেলল আমার ভীষন শান্ত strong বাচ্চাটি।সে চরম ক্রিকেট ভক্ত।তার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন প্যাশন টার্গেট-- বাংলাদেশের জাতীয় দলের হয়ে ক্রিকেট খেলা।
তিন বছর বয়স থেকে টিভির সামনে বসে এই স্বপ্নের শুরু ।এরপর নানা ভাইয়ের সাথে বিভিন্ন স্টেডিয়াম ঘুরে ঘুরে ডাই হার্ট ফ্যান হয়ে যাওয়া।
কাঁদতে কাঁদতে বলল - মা প্লিজ আমাকে খেতে বল না আজকে।আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ম্যাশের জন্য।আমি বড় হতে হতে পাপন আর হাতুড়ে আংকেল মরে যাবে না বল ? ওনারা পচা( পিচ্চি বাংলা ইংরেজি যত খেলার নিউজ পোর্টাল আছে সবগুলো পড়ে।তাই সে এদের দুজনের অবদান সম্পর্কে জানে ! )
আমি জানি এই ঘটনা শুধু আমার ঘরের না বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বহু বাংলাদেশীর ঘরের চিত্র।
মাশরাফির চেয়ে ভালো মানের পেসার অলরাউন্ডার ক্রিকেট ইতিহাসে অভাব নেই,জানি। কিন্তু একটা জায়গায় তিনি অনন্য অসাধারণ! মাশরাফির মতো অফুরন্ত প্রাণশক্তি, দেশপ্রেম, কমিটমেন্ট সম্পন্ন ক্রিকেটার শুধু এদেশ কেন, পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশে যেকোন সময়েই বিরল।
শারীরিক কারণ হিসেব করলে অনেক আগেই ক্রিকেট থেকে অবসরে যাওয়ার কথা মাশরাফির।আর আমাদেরকে এত বোকা ভাবার কি আছে !!! শারীরিক কারন প্রধান হলে 20 ওভার নয় বরং 50 ওভারে অবসরে যাবার কথা ম্যাশের।তাহলে ক্রিকেট নিয়ে সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে এদেশে বোঝাই যাচ্ছে।
শক্ত মেরুদণ্ডের ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন সবার ভালোবাসার অধিনায়ককে ছাটাই করে দিলে পরের কাজগুলো খুবই সহজ হয়ে যায় যে !!
খুব জানতে ইচ্ছে করছে---মাশরাফির এরকম একদম হঠাৎ করে টি২০ থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষনার কারণ আসলে কি?
এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে দুটো---
এক-তাকে চক্রান্ত করে বাধ্য করা হয়েছে। 
দুই-সে নিজের স্বেচ্ছায় নিয়েছে।
শ্রীলংকা সফরে যাওয়ার আগে ম্যাশ নিজেই সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ওয়ান ডের মতো টি২০ নিয়েও তার অনেক স্বপ্ন, পরিকল্পনা আছে। দলকে ভালো একটা পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু একদম হঠাৎই তার ভাবনা চিন্তা চেঞ্জ হয়ে গেল কিভাবে ?!!
গত সোমবার বিসিবি সভাপতি জনাব ক্ষমতাধর ক্রিকেট বোদ্ধা পাপন সাহেব চারজন সিনিয়র ক্রিকেটারদের ডেকে পাঠান এবং সবার সামনেই তিনি সরাসরি বলে দেন টি২০ এর জন্য নতুন অধিনায়ক চিন্তা করছেন।
খুব স্বাভাবিক ভাবেই ম্যাশের মতো আপোষহীন ব্যক্তিত্বের মানুষের আত্মসম্মানে লাগার কথা।অথচ অফিসিয়াল প্রটোকল কি বলে ? এ সংক্রান্ত প্রাথমিক আলোচনা করা উচিত ছিল- কোচ এবং ক্যাপ্টেনের সাথে। বিসিবি কি কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ? বিসিবির অফিসিয়াল প্রটোকল কি কারো মর্জিমাফিক ?
আর তখনই বদলে গেলো ম্যাশের চিন্তা ভাবনা।ঘোষণা দিলেন-- স্বেচ্ছা অবসরের।
আসলে বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড চলে সম্পূর্ণ দূর্নীতির উপর, স্বজন প্লীতির প্রেমে।এর আগে নাসির, আশরাফুল, মাহমুদুল্লাহ সহ বহু খেলোয়াড় বলী হয়েছে।ক্ষমতা এবং তার অপব্যবহার ই কথা বলে বিসিবি তে।

গতকাল টি২০ শেষে ম্যাশ সংবাদ সম্মেলনে অবসরে যাওয়ার জন্য যেসব কারণ দেখিয়েছে, তাও খুব একটা গ্রহনযোগ্য যুক্তিযুক্ত কারন বলে মনে হয়নি। ম্যাশ বলেছেন--- তার জন্য নাকি রুবেল দলে খেলতে পারছে না... তরুন খেলোয়াড় খেললে আগামী টি২০ বিশ্বকাপের জন্য নাকি ভালো হবে...ব্লা ব্লা ।
তাই যদি হবে গতকালের ম্যাচেও তো শুধু ম্যাশকেই খেলতে দেখলাম।তাকেই তো সব থেকে তরুন বলে মনে হলো।বাকিরা না ব্যাটিং না বোলিং না ফিল্ডিং কোথাও দাঁড়াতে পেরেছে।
আফসোস এই দুর্ভাগা জাতির জন্য---অন্য দেশগুলো খেলে আরেক দেশের বিরুদ্ধে আর আমাদের মাশরাফিদের খেলতে হয় নিজ দেশের হায়েনাদের বিরুদ্ধে !
দুঃখ লাগে মাশরাফির জন্য, আমরা ম্যাশের মতো মহানায়ককে তাকে হারাতে যাচ্ছি। ম্যাশ এমনই একজন বীর ---- যার মধ্যে নেই কোন অহংকার , নেই হেটার্স, নেই রাজনীতির মারপ্যাঁচ।যে টাকার জন্য খেলে না, দেশের জন্য খেলে,নিজের পা বাজি রেখে দেশের জন্য মাঠে দৌড়ায়।
#একজন_ম্যাশ_প্রতিদিন_জন্মায়_না
হাজার বছরে একটা মাশরাফি পাই আমরা।
আমার ছেলেটা যেন বড় হয়ে একজন মানুষ মাশরাফি হয়।
_________________________
লেখক ডা. নাসিমুন নাহার । লোকসেবী চিকিৎসক। মানবতাবাদী পরামর্শক।

শেয়ার করুন

0 comments: