বুধবার, জুন ২৮, ২০১৭

ভালোবাসার অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত: বাবা-মায়ের জন্য তিন সন্তানের স্বেচ্ছামৃত্যু!



সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের আত্মত্যাগের কথা কমবেশি সবাই শুনেছেন। সন্তানের ভালোর জন্য, মঙ্গলের জন্য নিজেদের জীবন উজাড় করে দিতে দু’বার ভাবেন না বাবা-মা। কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের জীবন দেয়া? এটা খুবই বিরল ঘটনা। বিশেষ করে ২০১৭ সালের এই দিনে এসেও যে কেউ এমনটা করতে পারে, সেটা স্রেফ ভাবা যায় না।

কিন্তু সেরকমই এক অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন লন্ডনপ্রবাসী তিন বাংলাদেশী ভাইবোন। বাবা-মায়ের সাথে সাথে নিজেরাও স্বেচ্ছায় আগুনে পুড়ে জীবনদানের নজির গড়েছেন তারা। ঘটনাটা ঘটেছে গত ১৫ জুন। লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে উত্তর কেনসিংটনের ল্যাঙ্কাস্টার ওয়েস্ট এস্টেটের লাটিমার রোডের ২৭ তলাবিশিষ্ট আবাসিক ভবন গ্রিনফল টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। সেই সময়ে বাড়ির ১৮ তলার বাসিন্দা তিন ভাইবোন এই অবিস্মরনীয় ঘটনার জন্ম দেন।


বাবা কামরু মিয়া (৮২) ও মা রাবেয়া বেগমের সাথে হামিদ (২৯)

আগুন লেগে যখন ধোঁয়া চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন ওই বাড়ির বাসিন্দারা সকলে নিরাপদ স্থানে সরে পড়তে থাকে। সেই সুযোগ ছিল শীঘ্রই বিয়ে হতে যাওয়া ২২ বছর বয়সী হুসনা বেগম, আর তার দুই বড় ভাই হানিফ (২৬) ও হামিদ (২৯)-এর সামনেও। কিন্তু তারা তা করেননি। বরং ফোন করে সকল আত্মীয়স্বজনদের জানান যে তারা ওখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এবং যে কারণে তারা এমন আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা শুনলে পিলে চমকে উঠবে সকলেরই। কেননা তাদের সাথেই ওই সময় ছিলেন তাদের ষাটোর্ধ্ব মা রাবেয়া ও ৮২ বছর বয়সী বাবা কামরু মিয়া। অমন পরিস্থিতিতে এই দুই বৃদ্ধকে নিয়ে কোনমতেই ১৮ তলা থেকে নামা সম্ভব ছিল না। তাই তাদের দুজনের জন্য মৃত্যু একপ্রকার নিশ্চিত ছিল। তবে তাদের তিন সন্তান চাইলেই নেমে আসতে পারতেন। কিন্তু তা তারা করেননি। কিভাবেই বা করবেন? বাবা-মাকে মৃত্যুর মুখে রেখে কি কোন সন্তানের পক্ষে সম্ভব কেবল নিজের কথা ভাবা, নিজের জীবন বাঁচানো? তাই তো তারা মনস্থির করেন বাবা-মায়ের সাথে পথচলার, একই সাথে নিজেরাও পরপারে পাড়ি জমানোর।

জানা যায়, স্থানীয় সময় রাত ১২.৫০-এর দিকে আগুন লাগে ওই বাড়িতে। তার আধা ঘন্টার মতো সময় পর থেকে রাত ১.৪৫ পর্যন্ত তিন ভাইবোনের সামনে ‘সুযোগ’ ছিল নিরাপদে বেরিয়ে আসার। কিন্তু তার বদলে তারা বাবা-মায়ের সাথেই রয়ে যান। এবং সর্বশেষ তাদের সাথে আত্মীয়স্বজনদের ফোনে কথা হয় রাত ৩.১০-এ।

তাদের চাচাত ভাই সামির আহমেদ (১৮) জানান, ‘ওদের বাবা একদমই হাঁটতে পারতেন না। তাহলে ওরা কি করত? তাকে ফেলে রেখে চলে আসত?’ সামির বিশ্বাস করেন, ‘রাত ১.৪৫ পর্যন্ত তিন ভাইবোন চাইলেই বেরিয়ে এসে কোন নিরাপদ স্থানে চলে যেতে পারত, কিন্তু তারা তা করেনি।’ সামির মনে করেন, তিন ভাইবোন যা করেছেন তা ঠিকই করেছেন। কেননা ওই মুহূর্তে তারা যদি শুধু নিজেদের কথা চিন্তা করে বেঁচেও থাকতেন, কিন্তু পরবর্তীতে সারা জীবন তাদেরকে এক দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেড়াত, তারা কখনো নিজেদের ক্ষমা করতে পারতেন না। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তীব্র অনুশোচনার আগুনে জ্বলতেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমার চাচী হানিফের সাথে কথা বলেছিল। সে খুবই শান্ত ছিল। সে বলেছিল যে তার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এবং কেউ যেন তাদের জন্য দুঃখ না পায়। কারণ তারা পৃথিবী থেকেও আরও ভালো কোন জগতের উদ্দেশে পাড়ি জমাচ্ছে।’
ভাই হানিফ (২৬)-এর সাথে বোন হুসনা বেগম (২২)

এদিকে গ্রিনফল টাওয়ার চ্যারিটি তাদের স্মৃতির স্মরণে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে, যেখানে লেখা হয়েছে- ‘তাদেরকে সাধুবাদ জানাই। তারা কাপুরুষতার পরিচয় দেয় নি। তারা তাদের মা ও বাবার সাথে শেষ পর্যন্ত থেকে গেছে। এ থেকে বোঝা যায় পরিবার তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা বেঁচেছে একসাথে, এবং মারাও গেছে একসাথে।’

এ ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন ওই তিন ভাইবোনের আরেক বড় ভাই মোহাম্মদ হাকিম। ঘটনার দিন সন্ধ্যায়ও তিনি ওই বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু অগ্নিকান্ডের অনেক আগেই তিনি ওখান থেকে চলে আসেন। আর তাই তাকেও বাবা-মা ও ভাইবোনদের মত জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে মরতে হয়নি।

আপনজনদের এমন মৃত্যুর শোক কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন হাকিম!

তথ্যসূত্র- mirror.co.uk

শেয়ার করুন

0 comments: