শুক্রবার, জুন ২৩, ২০১৭

অভাগা প্রবাসীদের কান্নাভেজা ঈদ

-আবছার তৈয়বী
মাহে রমজান আসতে না আসতেই খুব দ্রুত চলে যায়। খুশির র্বাতা নিয়ে উদিত হয়- ঈদের ‘বাঁকা চাঁদ’। ঈদের চাঁদ উঠলেই হঠাৎ করে প্রবাসীদের চোখের পাতা ভিজে ওঠলে। ঈদে প্রবাসীরা মা-বাবার পা ধরে ‘কদমবুছি’ করতে পারে না। মা-বাবার কবর জেয়ারতও করতে পারে না। সন্তানদের আদর করতে পারে না। সন্তানদের নানা রকম বায়না ধরার হাসি-কান্না উপভোগ করতে পারে না। ঈদের মার্কটিং নিয়ে গিন্নির মান-অভিমান দেখতে পারে না। ছোট বাচ্চাদের ‘ ঈদ সেলামী’ দিয়ে তাঁদের ‘তৃপ্তির হাসি’ দেখতে পারে না। এই দুঃখ বেশির ভাগ অভাগা প্রবাসীদের।
দেশে গেলে সবাই মনে করে আমরা ‘প্রবাসী’ যারা- তারা কত সূখে আছি! দেশের লোকের ধারণা- প্রবাসীদের শুধু সুখ আর সুখ। সুখের সাগরে প্রতিটি প্রবাসী ‘হাবুডুবু’ খায়। হাবুডুবু তারা খায় ঠিকই, তবে সুখের সাগরে নয়- দুঃখের সাগরে। দেশবাসীর ধারণা- প্রবাসে নিত্য বসে ‘সুখের হাট-বাজার’। সেই সুখ প্রবাসীরা কিছু খায় আর কিছু গায়ে মাখে। তাই পুরো দেশ শুদ্ধ পারলে যেন প্রবাসে চলে আসে। কিন্তু প্রবাসে এসে পড়ে ‘মাইনকা চিপায়’। কাউকে না পারে বলতে, না পারে সইতে। সে এক ‘বাকহীন’ যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণার বোঝা প্রতিটি প্রবাসী হৃদয়ে বয়ে চলে দিনের পর দিন। বছরের পর বছর। ঈদ আসলে যেখানে সবাই ‘তিড়িং বিড়িং’ করে লাফায়, সেখানে প্রবাসীর সম্বল কেবল মাথার বালিশ। সব দুঃখ, সব বেদনা প্রবাসীর চোখ দিয়ে কান্না হয়ে বেরোয়, আর ওই তেল চিটচিটে 'বালিশ' তা পরম মমতায় চুষে নেয়।
প্রবাসীরা সত্যিই ভাগ্যাহত। প্রবাসীরা বন্দি। বিদেশের কড়া আইন-কানুনের শেকলে প্রবাসীদের হাত-পা বাঁধা। একটু এদিক সেদিক হলেই ‘বড় ডেগ’র ভাত খাওয়া ছাড়া উপায় নেই। প্রবাস এক ‘দেয়ালহীন কারাগার’। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেই কারাগারে আমাদের দিন কাটে, রাত পোহায়। বছরের পর বছর। এটাই আমাদের নিয়তি! প্রবাসীদের জীবনে খুশি নেই, আনন্দ নেই, সাধ-আহ্লাদ নেই। প্রবাসীদের দেহ-মন ঘিরে আছে শুধু ‘বিষাদের ছায়া’। প্রবাসীরা মানুষ নয়, ওরা একেকজন টাকা কামানোর ‘মেশিন’! যে মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা যতো বেশি, পরিবারে সে মেশিনের কদরও ততো বেশি। দেশে একমাস টাকা পাঠাতে না পারলে প্রবাসীদের গিন্নীরা ‘থালা-বাসন’ সব উপুড় করে দিয়ে বলে- দেশে এসে তোমার ‘ছাও-বাও’ সামলাও। আমি চললাম...। কও কী? কই যাও জানু! সেটা কি তোমারে ‘কৈফিয়ত’ দিতে অইবো? ‘নো সাউন্ড’। যা বলছি তা শোন- আলমিরার চাবি চৌকাটের ওপরে আছে। বুঝে নিও। এবার প্রবাসী স্বামীর কাতর কণ্ঠ- ‘জানু! এইচ্ছা করে না'। আমারে এক সপ্তাহ্ টাইম দেও। তোমার জন্য টাকা পাঠাচ্ছি’। তোমার এক সপ্তাহর গোষ্ঠি কিলাই। একমাসে এক ‘কানাকড়ি’ও দিতে পারেনি, আর উনি এক সপ্তাহে 'আলাদিনের চেরাগ' পাবেন- বউয়ের শ্লেষমাখা উত্তর। প্রবাসী স্বামী বেচারার একূল-ওকূল দু’কূলই শেষ। প্রবাসীর অনুনয়-বিনয়ে পাথরের মন গলে। কিন্তু ‘আরবাব’ নামক ‘সংগে মর্মরের’ দিল গলে না। বাধ্য হয়ে প্রবাসীরা নানা অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। নানা বেআইনি কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ-রাসূল (দরুদ) কে রাজি করার দিকে তার খেয়াল নেই। ‘বউ’কে রাজি করতে পারলেই সে তার হাতে ‘সাত রাজার ধন’ পায়- অবস্থা। কেউ সাজে ‘বডুয়া’ (মেয়ের দালাল)। কেউ বেচে টেলিফোন কার্ড। কেউ পাকিস্তানী পাঞ্জাবিদের হয়ে বসায়- 'জুয়ার আসর'। কেউ ইন্ডিয়ান মালোয়ারিদের হয়ে বিক্রি করে- 'ব্লু ফিল্মের সিডি'। কেউ বেচে মদ। কেউ খুলে নেয় পার্কিং করা গাড়ির টায়ার। চোরের দশদিন তো- গেরস্থের একদিন। দশদিন নয়, ভাগ্যের রাশিতে ‘ফের’ বসলে প্রথম দিন বা ২য় দিনে তাকে ‘শোরতা’ (পুলিশ) বা ‘সিআইডি’র হাতে ধরা খেতে হয়। ‘হ্যান্ডক্যাপ’ পরিয়ে সবার সামনেই গাড়িতে তুলে নেয় আমার প্রবাসী ভাইটিকে। বিচার পরে হবে। আগে মাসের পর মাস, বছরের পর জেলের ঘানি টান। ততোদিনে দুবাইওয়ালার সুন্দরী বউ ‘ফুরুত’!

আপনারা ভাবছেন- আমি গল্প করছি। হ্যাঁ ,গল্পই তো! অন্য দেশের কথা জানিনা- এটা আমিরাত প্রবাসীদের গল্প। তবে বানোয়াট গল্প নয়। এ গল্প ‘জীবন থেকে নেয়া’। আমিরাতের জেলে কত শত প্রবাসী বাঙালি পড়ে আছে জানেন? বেশি নয়- ফাঁসির আসামি ২১ জন, যাবজ্জীবন ১১৯ জন আর বিভিন্ন মেয়াদে সাজা কাটছে দেড় হাজারেরও অধিক। দু’চার দিন বা দু’য়েক মাস জেল খাটা লোক আছে ১০ হাজারেরও অধিক। আপনারা ভাবছেন- ওদের দেখভাল করার জন্য কি ‘দূতাবাস’ নেই? ‘কনস্যুলেট’ অফিস নেই? আছে, সবই আছে। দূতাবাস ও কন্সুলেট অফিসে আলাদা ‘লেবার উইং’ও আছে। কিন্ত তাদের ঠাঁট দেখলে আপনি মূর্ছা যাবেন। যদি আপনার মাথায় চক্কর না আসে, আপনি স্থির থাকতে পারেন, তাদের আচার-ব্যবহার দেখে আপনার বলতে ইচ্ছে করবে- ‘ধরণী দ্বিধা হও- আমি তোমার ভেতরে হান্দাই’। এখানে আপনি যে কোন মিনিস্ট্রি বা সরকারি অফিসে বিনা বাঁধায় ‘সচিব’ লেবেলের সবচেয়ে বড় কর্তাটির সাথে দেখা করতে পারবেন, হাত মেলাতে পারবেন, সমস্যার কথা বলতে পারবেন। মাগার ‘দূতাবাস’ বা ‘কনস্যুলেট’ অফিসের বড় কর্তার দেখা পাওয়া আর আমবস্যায় চাঁদ দেখা- একই কথা। ‘কেরানী’ লেবেলের ছোট ছোট যে সব কর্তা আছেন, তারা একেকজন ইংরেজ লাট ‘মাউন্ট বেটনের’ ছোটভাই! আপনার সমস্যার কথা বলবেন? তাঁদের শোনার টাইমই নাই! এই হলো- আমিরাত প্রবাসীদের সার্বিক অবস্থা।
তবে সবার অবস্থা যে একই রকম- তা কিন্তু নয়। ভালো ও অবস্থাসম্পন্ন প্রবাসী, গাড়ি-বাড়ির মালিক, ব্যবসায়ী ও চাকুরিজীবি অনেকেই আছেন। তাঁরা কোথাও ঠেকেন না। ঠেকলে তাদের জন্য ১৪টি দরোজা আর ৩২টি জানালা খোলা আছেই। একটা না একটা দিয়ে তারা ঠিকই বেরিয়ে যায়। তাঁদের নিয়ে মাথা-ব্যাথা করার কিছুই নেই। আমি গরীব মানুষ। গরীব-দুঃখী মানুষের কথাই বলছি। প্রবাসীদের ঈদ নিয়ে কোন খুশির খবর শোনাতে পারলাম না বলে আন্তরিকভাবে আমার সকল পাঠক-পাঠিকার কাছে ক্ষমা চাইছি।
আমরা প্রবাসীরা কারো 'হায়াতে'ও নেই, কারো ‘মউতে’ও নেই। কারো বিয়েতে নেই, কারো মেজবানে নেই। হাটে নেই, বাজারে নেই। সামাজিক উন্নয়নে নেই। মিলাদে নেই। জনসভায় নেই। আনন্দ-উল্লাসে নেই। প্রবাসীর 'ঈদ আনন্দ' নেই। মাটি, সব মাটি। কিন্ত যে মাটি আমাদের টানে- সে বাংলা মায়ের 'সোঁদা গন্ধে' ভরা মাটির ঘ্রাণ নিতে পারি না অনেকেই। যে মাটির মায়া 'নিত্য জাগে আমাদের হৃদয় মাঝে'- অনেকেই প্রাণ থাকতে আর সে মাটির দর্শন লাভ করতে পারি না। দু’চোখে দেখতে পাইনা- বাংলার ষড় ঋতুর খোলা আকাশ। প্রাণ ভরে নিতে পারি না- বাংলার 'উথাল-পাথাল' হাওয়ার ঘ্রাণ। তার আগেই অনেক প্রবাসীর প্রাণপাখি চির দিনের জন্য ‘গুডবাই’ বলে চলে যায়- এক অচিন দেশে। আমার প্রবাসী ভায়ের শ্যামলা দেহটি পড়ে থাকে কোন হাসপাতালের মরচুয়ারিতে; ঠিক ফ্রিজে রাখা মুরগির মতো। সুপার মার্কেট বা সুপার শপের ডিপ ফ্রিজে আমরা যেভাবে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে মুরগি বাছাই করি; ঠিক সেভাবে আমার অভাগা ভাইয়ের মৃতদেহটির অসম্মান করা হয়। যাদের আত্মীয়-স্বজন প্রবাসে থাকে, তাদের মৃতদেহটি অনেক কষ্টে দেশে পৌঁছলেও অধিকাংশ গরীব লেবারের মৃতদেহ মাসের পর মাস পড়ে থাকে বিশাল এক ‘ডিপ ফ্রিজে’। ফ্লাইউডের 'বাক্স' রেডিই থাকে। 'ভাগ্যবান' অভাগা মৃতদেহটি একসময় বড় অযত্মে দেশে যায়। প্রবাসীদের মধ্যে যারা জানাযা পড়তে যায়- মৃতদেহের প্রতি এমন অসম্মান দেখে তারা নিজের অজান্তেই আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে ফরিয়াদ করে- "প্রভু হে! আর যাই কর, দয়া করে আমাকে এমন ‘যিল্লতীর বাক্সবন্দি’ করো না"।
হ্যাঁ, আমরা সেই প্রবাসী- যারা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখি। আমরা রেমিটেন্স যোদ্ধা। প্রতিটি দেশে প্রবাসীদের জন্য নানা সুযোগ সুবিধা থাকে। আমাদের দেশে প্রবাসীদের থেকে সুবিধা নিতেই সবাই এক পায়ে খাড়া। দেশের এয়ারপোর্টে লাটবাবুদের হাতে নিরীহ প্রবাসীরা প্রতিদিনই নিগৃহীত হয়। আমরা সেই প্রবাসী- যারা মুরগির খামারের মতো এক সীটের ওপর তিন সীট তুলে 'বাক্সবন্দি' হয়ে জীবন যাপন করি । প্রবাসে জীবনেও ‘বাক্স’ আমাদের নিত্য সঙ্গী, মরনেও ‘বাক্স’ আমাদের ললাট লিখন। ধিক, শত ধিক! আমাদের এই 'বাক্সময়' জীবনকে। দেশের রিক্সাঅলা বা ঠেলাঅলা ‘খেপ’ মেরে মুখে পানের খিলি গুঁজে দিয়ে যে ‘প্রাণবন্ত হাসি’ ছড়িয়ে দেয়- বিশ্বাস করুন, লাখ টাকা মাইনে পাওয়া কোন প্রবাসীর মুখে আমি সে হাসি দেখিনি। তারপরও আমরা সুখে আছি। আমাদের সুখে থাকার অভিনয় করতে হয়। আমাদের সব সুখ ঈদের জামাতের পর চোখের পানিতে বালিশে ‘আমানত’ রাখবো। ভাগ্য বিড়ম্বিত সেই প্রবাসীদের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানাই। ‘ঈদ মোবারক’।
তারিখ: ২৩ জুন, ২০১৭ খৃ.
এয়াছিন নগর, রাউজান। চট্টগ্রাম।
মুহাম্মদ নূরুল আবছার তৈয়বী: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি- প্রবাসী সাংবাদিক সমিতি (প্রসাস)- দুবাই, ইউ.এ.ই।
প্রতিষ্ঠাতা: আদর্শ লিখক ফোরাম (আলিফ), চট্টগ্রাম।
নির্বাহী সদস্য: আনজুমানে খোদ্দামুল মুসলেমীন, ইউএই কেন্দ্রীয় পরিষদ, আবুধাবি, ইউ.এ.ই।
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়ক: উজ্জীবন সাংস্কৃতিক সংস্থা, (উসাস)।

শেয়ার করুন

0 comments: