শনিবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটি থেকে মুক্তির উপায়

দেশের খবর ডেস্কঃআমাদের দৈনন্দিন জীবনে গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটি খুব পরিচিত নাম। চিকিৎসকেরা যদিও দুটোর মধ্যে পার্থক্য করেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে বুক জ্বলা বা পেট ফাঁপা মানেই গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে পেপটিক আলসারও বলা হয়ে থাকে। গ্যাসের জন্যে পাকস্থলীতে হালকা থেকে অনেক গভীর সমস্যাও হতে পারে। বুকে ব্যথার তীব্রতা বেড়ে গেলে অসম্ভব কষ্ট হয়। তখন গ্যাস্ট্রিকের ব্যথানাশক ঔষধ খাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বিভিন্ন কারণে আমাদের গ্যাসের সমস্যা হতে পারে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে এই সমস্যাগুলো কিছু নিয়মকানুন ও ঘরোয়া কিছু খাবারের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। আর সেরকম কিছু ঘরোয়া সমাধান নিয়েই আজ আলোচনা করা হলো।
রসুন
গ্যাসের সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পেতে রসুন একটি অনন্য কার্যকরী উপাদান। রসুন, গোল মরিচ গুঁড়ো, ধনে ও জিরে গুঁড়ো একসাথে মিশিয়ে পানিতে ফুটিয়ে নিতে হবে। পানি সিদ্ধ হয়ে এলে তা ছেঁকে আলাদা করে নিতে হবে। পানি ঠাণ্ডা করার পর সাধারণ তাপমাত্রায় এনে এক চামচ মধু দিয়ে দিনে দু’বার পান করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। এছাড়াও গ্যাসের সমস্যা দূর করার জন্যে রসুনের স্যুপও বেশ কার্যকরী।
আদা
আদা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শরীরের বুক জ্বালা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে। আদা হজমেও বেশ সহায়তা করে। প্রতিদিন খাওয়ার আগে বা পরে এক টুকরা আদা চিবিয়ে খেলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। সকালবেলা গরম পানিতে আদা সিদ্ধ করে খাওয়া শরীরের জন্যে বেশ উপকারী।
গোল মরিচের গুঁড়ো
গোল মরিচের গুঁড়ো আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হয়। এই গুঁড়ো শরীরে এসিডিটি এবং বদহজম কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। গোল মরিচের গুঁড়ো শরীরে হাইড্রোলিক এসিড ছড়াতে সাহায্য করে, যা পাকস্থলীর এসিডিটি কমাতে সাহায্য করে। তালের বা আখের গুড়ের সাথে গোল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। গোল মরিচের গুঁড়ো, আদা গুঁড়ো, ধনিয়া গুঁড়ো এবং সমান পরিমাণ শুকনো পুদিনা পাতা একসাথে মিশিয়ে দিনে দু’বার দুধের সাথে মিশিয়ে খেতে হবে।
কালো জিরা
এসিডিটির ব্যথা কমানোর জন্যে কালো জিরা বেশ উপকারী। কালো জিরার অনেক ঔষধি গুণ রয়েছে। চায়ে কালো জিরা মিশিয়ে খেলে বেশ উপকার হয়। কালো জিরার চা বানানোর জন্যে, প্রথমে এক কাপ গরম পানিতে এক চা চামচ কালো জিরা বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে। এক চামচ মধু মিশিয়ে দুপুরে অথবা রাতের খাবারের পূর্বে এক কাপ কালো জিরার চা হজমে বেশ সাহায্য করে।
ঘোল বা মাঠা
টক দই দিয়ে তৈরি এই পানীয়কে আঞ্চলিকভাবে অনেকেই ঘোল বা মাঠা বলে থাকে। এসিডিটি কমাতে ঘোল বা মাঠা বেশ ভালভাবেই সাহায্য করে। এর কারণ হলো টকদই বেশ হজম উপকারী। টক দইয়ে লেবুর রস, পুদিনা পাতার রস, আদার রস, সামান্য লবণ এবং প্রয়োজনমত চিনি বা মধু মিশিয়ে ঘোল বানাতে হয়। খাওয়ার পর এক গ্লাস মাঠা শরীরের সকল ক্লান্তি দূর করে হজমে বেশ সাহায্য করে।
লবঙ্গ
পেটের হজমে লবঙ্গ বেশ কার্যকরী। কয়েকটি লবঙ্গ মুখে দিয়ে চিবুতে থাকলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। এটির স্বাদ কিছুটা বিস্বাদ হলেও ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায়। লবঙ্গ বমির ভাব কমাতেও বেশ সাহায্য করে। লবঙ্গের রস খুব সহজেই এসিডিটি কমিয়ে আনতে পারে।
মৌরি
আমাদের রান্নাঘরে মৌরির কৌটা থাকা বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার। হজমের জন্যে ভরা পেটে মৌরি চিবানো বেশ উপকারী। মৌরি গরম চায়ের সাথে খেলেও বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। গরম পানির সাথে চায়ের পাতা গরম করে, তার সাথে মৌরি ভালোভাবে ফুটিয়ে নিয়ে কিছুটা দুধ দিয়ে খেলে শরীরে চনমনে ভাব ফিরে আসে।
দারুচিনি
যারা নিয়মিত রান্না করেন তাদের জন্যে দারুচিনি খুব পরিচিত একটি নাম। সেই প্রাচীনকাল থেকে হজমের জন্যে কবিরাজদের মূল চিকিৎসা ছিল দারুচিনি সেবন। প্রাকৃতিকভাবেই এটি অম্লনাশক হিসেবে কাজ করে এবং পাকস্থলীর গ্যাস কমিয়ে আনতে বেশ সাহায্য করে। দারুচিনি আসলে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়। রান্নায় তো প্রতিনিয়ত এর ব্যবহার হয়েই থাকে, এছাড়াও স্যুপ বা সালাদেও দারুচিনির গুঁড়ো ব্যবহার করা যেতে পারে। আরও ভালো ফলাফল পাওয়া যায়, যদি গরম পানি অথবা দুধের সাথে দারুচিনির গুঁড়ো সিদ্ধ করে খাওয়া যায়।
আমলকি
আমলকি শরীরের জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল। এটি শুধুমাত্র যে হজমেই সাহায্য করে এমন নয়, এটি চুল, পাকস্থলী এবং চামড়ার জন্যেও বেশ উপকারী। প্রতিদিন খালি পেটে আমলকির জুস খেলে সারাদিনের জন্যে শরীরে ব্যাপক শক্তি সঞ্চিত হয়। আমলকিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে, যা এসিডিটি এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে বেশ সহায়ক।
যোয়ান
যোয়ান বা আজোয়ান আজকাল বেশ পরিচিত একটি নাম। ধনে গাছের মতো দেখতে গাছগুলোতে সাদা রঙের এক ধরনের ফুল হয়। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ এলাকায় এর ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে। এর বীজ সরাসরি খাওয়া যায়, আবার যোয়ানের তেলও পাওয়া যায়। পেটফাঁপা, ক্ষুধামন্দা এবং মুখের গন্ধ কমাতে যোয়ান বেশ উপকারী। এছাড়াও গরম পানির সাথে মিশিয়েও যোয়ানের পানি পান করা যায়।
হলুদের পাতা
সুস্বাস্থ্যের জন্যে হলুদের পাতার বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। হলুদের পাতা গুঁড়ো করে গরম দুধের সাথে সিদ্ধ করে খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়। হলুদের পাতা গ্যাসের সমস্যার পাশাপাশি ত্বকের যত্নেও বেশ সাহায্য করে।
আলুর রস/জুস
পাকস্থলীতে গ্যাসের প্রভাব কমাতে আলুর রস বা জুস খুব উপকারী। কয়েকটি ছোট আকারের আলু পিষে অথবা ব্লেন্ড করে পানিতে খানিকটা মধু এবং লবণ দিয়ে দুপুরে খাওয়ার আগে খেলে বেশ ভালো উপকার পাওয়া যায়। যাদের গ্যাসের সমস্যা তীব্র, তারা দিনে দুই থেকে তিনবার এই জুস পান করতে পারেন। কিন্তু স্বাদের দিক বিবেচনা করলে এই জুস খাওয়াটা অনেকের জন্যেই কষ্টসাধ্য।
পুদিনা পাতা
পুদিনা পাতার রস পাকস্থলীর গ্যাস ও বমিভাব কমাতে বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। গ্যাসের ব্যথা শুরু হওয়ার সাথে সাথে কিছু পুদিনা পাতা মুখে নিয়ে হালকা চিবিয়ে নিলে ভালো ফল হবে। এছাড়াও গরম পানিতে পুদিনা পাতার চা তৈরি করে তার সাথে মধু মিশিয়ে খেলেও তা শরীরের জন্যে বেশ উপকারী।
আয়ুর্বেদিক চা
বর্তমানে আয়ুর্বেদিক চা খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আয়ুর্বেদিক চায়ের পাতা আজকাল খুব সহজেই পাওয়া যায়। তবে নিজে ঘরে বানিয়ে খেতে চাইলে তুলসীর পাতা, পুদিনা পাতা, আঙ্গুরের রস, কালো জিরা ইত্যাদি মিশিয়ে চা পান করা যেতে পারে।
এতক্ষণ যেসব উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো, তার বেশিরভাগই বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক এবং প্রাকৃতিক উপকরণ, যা কম-বেশি আমাদের প্রত্যেকের ঘরে রয়েছে এবং এগুলো বেশ সহজপ্রাপ্যও। কিন্তু শুধু এসব উপকরণ খাওয়ার উপর নির্ভর করলে বা নিয়মিত খেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমে যাবে, এমন ভাবাটা যুক্তিযুক্ত হবে না। গ্যাস বা এসিডিটির প্রভাব কমানোর জন্যে আমাদের নিয়মিত কিছু অভ্যাস তৈরি করতে হবে। এবার সেসব অভ্যাস নিয়ে আলোচনা করা হলো।
খাওয়ার অভ্যাস
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খাওয়ার অভ্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। প্রতিদিন দুপুরের এবং রাতের খাবার একটি নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। রাতের খাবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খেয়ে ফেলা উচিত। সকালের নাস্তা বেশ ভালোভাবে করার চেষ্টা করতে হবে। অন্যদিকে দুপুরের আহার একটু হালকা করা বাঞ্ছনীয়। একেবারে খুব বেশি না খেয়ে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর অল্প খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
অতিরিক্ত তেল জাতীয় খাবার পরিহার
যারা নিয়মিত গ্যাসের সমস্যায় ভুগছেন, তারা শুধুমাত্র ঔষধের উপর নির্ভর না করে খাবারের ব্যাপারে বেশি নজর দেয়া উচিত। অতিরিক্ত তেল জাতীয় খাদ্য, ফাস্টফুড, মশলাদার খাবার ইত্যাদি ত্যাগ করা উচিত। দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় সুষম খাদ্যের ভারসাম্য মেনে চলা উচিত। নিত্যদিনের খাবারে তেলের ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে আনতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণ ফল খেতে হবে।
পর্যাপ্ত পানি পান করা
গ্যাসের সমস্যা কমাতে প্রচুর পানি পান করা উচিত। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করা নিশ্চিত করতে হবে।
ধূমপান ত্যাগ করা
অতিরিক্ত ধূমপানের ফলেও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। ধূমপান থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য এবং এর জন্য প্রয়োজন প্রবল ইচ্ছাশক্তির। তবে গ্যাসের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে ধূমপানের অভ্যাস অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
ঘুমের অপর্যাপ্ততা গ্যাসের সমস্যায় একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ। ঘুমের সাথে আমাদের পুরো শরীরের চলাচল সরাসরিভাবে সংযুক্ত। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে, অতিরিক্ত চিন্তা করলে অথবা খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে থাকলে হজমের ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধা হয়। তাই খেয়াল রাখতে হবে যেন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম নিশ্চিত করা যায়।
ব্যায়াম
ব্যায়ামের নাম শুনলে অনেকেই ভয়ে দু’পা পিছিয়ে যান। সত্যি কথা বলতে কী, বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাগুলোর কারণ হচ্ছে নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব। বিশেষ করে চাকুরিজীবীদের ব্যায়াম করাটা আজকের দিনে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবে আকাঙ্ক্ষা এবং একাগ্রতা থাকলে প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করা খুব একটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সকলের খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যেন দুপুর বা রাতে খাওয়ার সাথে সাথেই শুয়ে না পড়ি। অন্তত খাওয়ার এবং ঘুমানোর মধ্যে এক থেকে দু’ঘণ্টার ব্যবধান থাকা একান্ত আবশ্যকীয়।
অনেকের প্রাত্যহিক জীবনে গ্যাসের সমস্যা ক্রমান্বয়ে প্রকট হয়ে পড়েছে। আজকাল গ্যাসের সমস্যা ছাড়া কাউকে খুঁজেই পাওয়াই মুশকিল। গ্যাসের ওষুধ এখন অলিতে-গলিতে, পাড়ার ছোট্ট দোকানটাতেও পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত ওষুধ সেবন কোনোভাবেই ভালো নয়, সেটা নিশ্চয়ই কারও অজানা নয়। তাই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে প্রাকৃতিক প্রতিকারগুলো প্রয়োগ করাটা খুব একটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার মনে না করাই উত্তম।

শেয়ার করুন

0 comments: