বুধবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৭

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে প্রস্তাব পাস

















রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চালানো নিধনযজ্ঞ ও তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় কাউন্সিলের ৩৩ সদস্য দেশের ‘হ্যাঁ’ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়েছে। এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ‘না’ ভোট দিয়েছে তিনটি দেশ। বরাবরের মতো চীন মিয়ানমারের পক্ষ অবলম্বন করে ‘না’ ভোট দিয়েছে। অন্য দেশ দুটি হলো ফিলিপাইন ও বুরুন্ডি। ভোট দেয়া থেকে বিরত থেকেছে ভারতসহ নয়টি দেশ। প্রস্তাব পাসের ভোট প্রক্রিয়ায় মোট ৪৫টি দেশ অংশ নেয়।
প্রস্তাবে গত ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নিধনযজ্ঞের কড়া নিন্দা জানানো হয়েছে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতার জন্য দায়ী সেনা ও উগ্রপন্থীদের বিচারের মুখোমুখি করতে বলা হয়েছে। প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, সেনা অভিযান বন্ধ করতে হবে। সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের মুখে মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। তাদের মানবাধিকারের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। মানবাধিকার রক্ষায় মিয়ানমারকে প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। এর আগে গত ১৬ নভেম্বর থার্ড কমিটি নামে পরিচিত জাতিসংঘের সামাজিক, মানবিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক ফোরামে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিপুল ভোটে একটি প্রস্তাব পাস হয়। ওই প্রস্তাবে জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেসকে মিয়ানমার বিষয়ে একজন বিশেষ দূত নিয়োগ করতে বলা হয়।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের অনুরোধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশনটি ডাকা হয়। এ ধরনের অধিবেশন ডাকতে হলে ৪৭ সদস্যের কাউন্সিলে ন্যূনতম ১৬টি দেশ বা এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সৌদি আরব ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপানসহ কাউন্সিলের ৩৩টি সদস্য দেশ ও ৪০টি পর্যবেক্ষক দেশ বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তাবে সমর্থন দেয়।
এদিকে প্রস্তাব পাশের আগে ২৭তম বিশেষ অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতায় ‘গণহত্যা’ এর আলামত ও অভিযোগের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। সেখানে আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা ব্যাপক, পর্যায়ক্রমিক এবং হতাশাজনক। এটা কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ। তিনি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই ‘পাগলামো’ অবিলম্বে বন্ধ করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদকে আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সেখানে গণহত্যার সকল বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। এই বিষয়টি কেউ অস্বীকার করতে পারে না। যৌন সহিংসতাসহ রোহিঙ্গাদের ওপর যেসব নির্যাতন চালানো হয়েছে তা খুবই বিরল। তিনি সংকটের মূল কারণ চিহ্নিত না করে ও যথাযথ মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের অনুপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে সতর্ক করেন। এ সময় তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশমালা পাঠানোর আহবান জানিয়ে বলেন, অভিযোগের তীব্রতার প্রেক্ষিতে একটি পক্ষপাতহীন, নিরপেক্ষ ‘মেকানিজম’ প্রতিষ্ঠা করা দরকার। যাতে করে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের পাশাপাশি তারা সর্বশেষ সহিংসতা ও নির্যাতনের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে অপরাধ তদন্ত করতে পারে।
অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা শুধু ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যার সঙ্গেই তুলনা করা চলে। তিনি বলেন, মিয়ানমার এখনো পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করেনি। বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে দ্বিপাক্ষিকভাবে এই ইস্যুটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে। মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত চাপই এক্ষেত্রে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে। জাতিসংঘের জেনেভা কার্যালয়ে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হতিন লিন উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কিছু বলেননি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তে মানবাধিকার পরিস্থিতি তার দেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এই সংকট নিরসনে ইয়াঙ্গুন সব ধরনের চেষ্টা করছে বলে তিনি দাবি করেন।
প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করলেও আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলকে বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এই অধিবেশনটিতে প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ বাংলাদেশ এক মাস আগেই নিয়েছে। এই প্রস্তাব রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে একটি তাত্পর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

শেয়ার করুন

0 comments: