মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৭

শিশুর নৈতিকতা ও মেধার বিকাশে পরিবারের ভূমিকা

আগামীর কর্ণধার শিশু । যারা আজকের কুড়ি ভবিষ্যতের ফুল হয়ে ফুটবে শিশুরা । আগামীর স্বপ্ন যাদেরকে নিয়ে তারাই দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে । শিশুরাই জাতি গঠনের মূলভিত্তি । শব্দটি নাম শুনলেই হৃদয়ের নিভৃতে ভালবাসা আর স্থেহের ঢেউ উত্থেলিত হয়; যা অকৃত্রিম ও মধুর ।জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত সকল ব্যক্তিকেই বুঝায় । জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ অনুযায়ী শিশু বলতে আঠারো বছরের কম বয়সী সকল । দেশের প্রচলিত কোন আইনে ভিন্ন থাকলেএই নীতির আলোকে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে সামঞ্জস্য বিধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা যাবে । সূত্র: ( গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়) বিশ্বের ২৫ ভাগই শিশু । তারাই আগামী দিনের জাতির কর্ণধার । যে পরিবেশে শিশুরা বেড়ে ওঠে তার পরিবর্তন করতে হবে, তা না করতে পারলে শিশুদের স্বপ্ন ও আগামীর কর্ণধারেরা হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে ।প্রশ্ন হলো যথাতথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সকল শিশুরা কী পেয়েছে সঠিকভাবে নিজের মনমানসিকতার বিকাশ করতে ।আর পরিবারই কতটুকু অবদান রেখেছে শিশুর নৈতিক, মানসিক, দৈহিক চাহিদা মেটাতে । রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানী ৮ বছরের শিশু । তার এখন বই খাতা আর বন্ধুদের নিয়ে হাসিখুশি থাকার কথা । সমাজের অনেক শিশুই বঞ্চিত তার ন্যায্য অধিকার থেকে । এরকম অনেক শিশুর মতামত হলো – কেন বঞ্চিত তারা ? ছোট কচিকাচাদের স্বপ্ন কেন এই চায়ের দোকান আর গাড়ির মেকানিক শ্রমে বন্দী । শিশুদের সার্বিক ও মানসিক চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ করে দিতে হবে পরিবারকেই । শিশুর প্রশ্নের উত্তর কখনো এড়িয়ে যাওয়া যাবেনা । বয়স ও জ্ঞানের ভিত্তিতে তার উত্তর দিতে হবে সঠিক সুন্দর সূচারুরূপে । পরিবারের জ্যৈষ্ঠ সদস্যদের তাদের পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যের মতামতকে গুরত্বসহকারে পর্যবেক্ষন করতে হবে । শিশুর মেধাবিকাশে ও মানসিক চিন্তা চেতনার পরিস্ফুটনে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্ত পশ্চিমা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পরিবার প্রথা ভেঙে যাচ্ছে । যার ফলে শিশু হারাচ্ছে তার বাবা-মা, তার মেধার ও মানসিক বিকাশের সুর্বণ সুযোগ । আর এই পরিবার ভেঙে যাওয়ার মধ্যে শিশুর স্বপ্নও ভেঙে যায় ।
যৌথ পরিবারগুলোও একক ক্ষুদ্র পরিবারে পরিণত হচ্ছে । যার ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতা। শিশুরা তার চিন্তা চেতনা ভাবনা সবকিছুই নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয় । পারিবারিক বন্ধন থেকে শিশুরা দূরে যায় মায়া মমতার বাধন হতে । অনেক জায়গায় দেখতে পাই – পরিবারের সদস্যেদের অবহেলা-অনাদর বা কঠোর নিয়ম শৃংঙ্খলায় বেড়ে ওঠা সন্তানরা কুপথে চলে যায় । যথাসময়ে বিদ্যাপীঠে না গিয়েই বিভিন্নস্থানে আড্ডা দেয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলেও পালিয়ে চলে আসে । আবার অনেকেই বন্ধুর প্ররোচনায় সিগারেট হাতে নিতে দ্বিধাবোধ করেনা । অল্প বয়সেই মাদকের ছোবলে হারিয়ে যায় শিশুর স্বপ্ন আর পরিবারের সমাজের আগমীর পথচলা । তখন অপরাধীচক্রের সদস্যরা এই সুর্বণ সুযোগে এসব পারিবারিক শৃংঙ্খলের বেড়াজালে বেড়া ওঠা শিশুদের দিয়ে বিভিন্ন কুকর্ম ঘটায় । সময়ের পরিবর্তে শিশুরা এসব খারাপ কাজে অভ্যস্ত হয়ে যায় কারণ নগদ অর্থ সম্পদের লালসায় । শিশুরা অধিকাংশ সময়ই অবহেলিত থেকে যায় পরিবারে । বিশেষ করে ১৪ বছর থেকে ১৮ বছর পযর্ন্ত যারা তাদেরই এই সমস্যা একটু বেশি লক্ষ্য করা যায় । এই বয়সেই নানা আনুষাঙ্গিক পরিবর্তন ঘটে থাকে । যা তার মাঝে একধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসে । ধীরে ধীরে সে পরিবার থেকে দূরে যায় । পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার মতামত ততোটা গুরত্বসহকারে দেখা হয়না । বর্তমান কালের শিশুরা আত্মকেন্দ্রিক । বাবা মা চায় না তার সন্তান মিশুক বিভিন্ন পরিবারের খেলা সাথীর সাথে । ছোট বয়স থেকেই সন্তানকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে । ভর্তির সময় তারা (বাবা-মা) বলেন- এখন যাওয়া আসা করুক । কিন্তু যখন পরীক্ষা আসে তখন বলেন তোমাকে অবশ্যই ভাল রেজাল্ট করতে হবে নইলে আমার মান ইজ্জত ধূলোয় মিশে যাবে । তুমি যেন (অভিভাবিকা) ভাবীর ছেলের চেয়েও আরো ভাল ফলাফল কর । আর এতেই সন্তানদের মাথায় পড়ালেখা নিয়ে বিরূপ ধারণা জন্ম নেয় শিশুবয়স থেকেই । নিজের রুম আর কম্পিউটার নিয়েই মজে থাকে । একা থাকার ফলে বিভিন্ন উদ্ভট চিন্তা জন্ম হয় তার মস্তিষ্কে । পনোর্গ্রাফি, খারাপসঙ্গের সাথে মিশে যায় । কেন তারা এটা করে? এর প্রশ্নের উত্তরে, অবশ্যই পরিবারের সদস্যদের ভূমিক্‌ বিশেষ করে বাবা মার দিকে প্রশ্নটা তাক করবে। বিগত ২০১৩ সালের ১৪ আগষ্ট ঢাকার চামেলীবাগের পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী স্বপ্না বেগম খুন হন নিজ মেয়ের হাতে বলে তথ্য দেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুল । এরকম হলো কেন ? এর উত্তর কী হতে পারে? পারবেন পরিবারের কর্তা বাবা আর কর্ত্রী মা । অনেক সময় দেখা যায় পরিবারের সন্তানদেরকে কঠোর নিয়ম শৃংঙ্খলায় কিংবা আবার কখনো পরিবারের সন্তানদের অবাধ চলাচলে বাধা দেয়া হয়না । একটি সুন্দর পরিবার, সমাজ গঠনের জন্য চাই একটি সুগঠিত নিয়মাবদ্ধ একটি পরিবার । শিশুদের মেধাবিকাশে প্রয়োজন নতুন সৃজনশীল উদ্যোগ ।
শিশুদের বই পড়তে আগ্রহী করে তুলতে হবে । শুধু পাঠ্য বই নয় বিশ্বের বিভিন্ন সাহিত্যের প্রতি তাদের আগ্রহী করে গড়ে তুলতে হবে । বর্তমান কালের শিশুরা প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যাওয়ায় এখন এসব শিশুদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি মায়া মমতা পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে । বিশেষ করে অফিস কর্মজীবী বাবা-মা থেকে অনেকটাই দূরে থাকার ফলে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় তারা বিভিন্ন কুসঙ্গে লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাবা-মা এসব জানতে পারেন না । বাবা মার উচিত শিশুদেরকে সময় দেওয়া, খোজ খবর নেয়া । শিশুদেরকে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে আগ্রহী করে তোলা । বিভিন্ন পত্রিকায় শিশুপাতা, টিভি চ্যানেলে শিশুদের শিক্ষনীয় প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন সৃজনমুখী কর্মকান্ডই পারেই শিশুদের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যেতে । অন্যান্য শিশুর সাথে শ্র্রমজীবী, প্রতিবন্ধী শিশুদের কথা ও সমাজ,পরিবারকে ভাবতে হবে । শ্রমজীবিদের শ্রম থেকে অব্যাহতি দিয়ে শিক্ষাঙ্গনের দিকে নিয়ে আসতে হবে । প্রতিবন্ধী শিশুরা ও এই সমাজের এই পরিবারের । তাদের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, বাড়িয়ে দিতে হবে সহযোগিতার হাত ।

পরিবারের সকল সদ্যস্যের সহযোগিতা পেলে মেধার বিকাশ হতে পারে । বেগম রোকেয়ার কথাই ধরুন, তার সময়ে মেয়েদের কোন পড়ালেখার সুযোগ ছিলনা । অথচ তিনি তার ভাইদের সহযোগিতায় ইংরেজি পড়তে শেখেন । পরবর্তীতে স্বামীর অনুপ্রেরণায় তিনি এগিয়ে যান । আমরা জানি মহিয়সী নারী হেলেন কেলারের কথা । যিনি শৈশবে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন । তিনি ভর্তি হয়েছিলেন প্রতিবন্ধী স্কুলে । নিজের মেধা আর পড়ালেখার প্রতি আগ্রহই তাকে নিয়ে গিয়েছিল সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে। জীবনে অন্ধদের কল্যানে অনেক সেবামূলক কাজ করেছেন । এসব সম্ভব হয়েছে কারণ তিনি পেয়েছিলেন পরিবারের সাহায্য সহযোগিতা । পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুসম্পর্কের অভাবই একটি সন্তানকে বিপথে ঠেলে দেয় । বাবা মায়ের ঝগড়া, মনোমালিন্য, অর্থনৈতিক সমস্যাসহ বহুসমস্যা সন্তানদের মানসিক বিকাশে বাধা হয়ে দাড়ায় যা শিশুর মনে তার পরিবার, সমাজ সমন্ধে বিরূপ ধারণা জন্মদেয়, সৃষ্টি করে হতাশা আর বিষন্নতা । অথচ পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা, অনুপ্রেরণা আর সঠিক নিয়ম শৃংঙ্খলা-আদর যত্ন অবদান রাখতে পারে তার সুন্দর আগামীর জীবন গঠনে ।
সুন্দর আগামীতে ফুটে ওঠবে সুন্দর সুশীল একটি সমাজ আজকের শিশুর হাত ধরে । শিশুরা এগিয়ে যাবে একই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাবে সমাজ ও জাতি ।


শেয়ার করুন

0 comments: