রবিবার, জুলাই ২৯, ২০১৮

প্রবাসীর বোবা কান্না


ছোট্ট অমি একটি সুন্দর বাড়ির দিকে আঙুল দিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, মা ওই বাড়িটি কার?
মা উত্তরে বললেন, ওই বাড়ি জগদীশ বাবুর।
অমি আবার প্রশ্ন করল, মা উনি বুঝি খুব বড়লোক।
মা বললেন, হ্যাঁ, উনি অনেক বড়লোক, অনেক টাকা পয়সার মালিক। উনি একজন শিক্ষিত ও জ্ঞানী লোক। সকলে তাঁকে ভয় পায়, সম্মান ও শ্রদ্ধা করে।
অমি বলল, মা, আমি ওনার মতো বড় হতে চাই।
মা বললেন, উনি অনেক শিক্ষিত মানুষ। শিক্ষিত মানুষ ছাড়া বড়লোক হওয়া যায় না। মনে রাখবে, লেখাপড়ে করে যে, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে।
অমি বলল, মা, আমি লেখাপড়া শিখে ওনার মতো বড় হব।

ছোটবেলার একটি শিক্ষণীয় অনুগল্প। এ গল্প শিশুদের বড় হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করে। মনে মনে বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনতে সহযোগিতা করে। সংকল্প করার সাহস জোগায়।

বর্তমানে এই অনুগল্পটি আর ব্যবহার করা হয় না। বর্তমানে বড় হতে হলে শিক্ষার কোনো প্রয়োজন হয় না। তাই এখন ছেলেমেয়েদের বলা হয়, বড় হতে হলে তোমাকে বিদেশে যেতে হবে। ডলার, পাউন্ড, ইউরো অথবা রিয়াল আয় করতে হবে। তবেই তুমি সকলের কাছে একজন সম্মানিত মানুষ হবে। এখন অভিভাবকেরা বলেন, অমি দেখ, ওই বাড়ির রহিম মালয়েশিয়া গিয়ে অনেক অর্থ উপার্জন করে কত সম্পত্তির মালিক হয়েছে। কী সুন্দর একটি বাড়ি করেছে, গাড়ি কিনেছে। সকলে তাদের মানে। জীবনে যদি বড় হতে চাও তবে বিদেশে গিয়ে বিদেশি টাকা আয় করো। অমি তখন থেকেই বড় হওয়ার বাসনা থেকে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে। একদিন পড়াশোনার পাঠ না চুকিয়েই বাবামায়ের জমি বিক্রি করে অজানার উদ্দেশে রওনা হয়। শুরু হয় নতুন জীবন। প্রবাসী জীবন। না বলা কাহিনির সীমাহীন যন্ত্রণার জীবন। তবুও অমিরা সোনার হরিণ ধরার জন্য জীবনের সকল আশাকে পুঁজি করে নিত্য নতুনভাবে পাড়ি জমায় সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য।

মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে বড়। স্বপ্ন পূরণের জন্য দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত-অশিক্ষিত তরুণ বিদেশে পাড়ি দেন। তাদের অনেকে জানেন না, সমুদ্রের ওই পাশে কী আছে। শুধু জানে, বিদেশ যেতে হবে, ডলার আয় করতে হবে, আর্থিকভাবে সচ্ছল জীবন গড়ে তুলতে হবে। এই ভাবনার বাইরে আরও অনেক কিছু ভাবার বা চিন্তা করার থাকতে পারে, সেটা ভাবার সময় তাদের থাকে না। চোখে বড় হওয়ার রঙিন চশমা লাগিয়ে, সবকিছুকে মনে করে স্বপ্নের মতো রঙিন। রঙিন নৌকায় পাল তুলে চলে যায় ভিন্ন একটি দেশে। যেখানে নেই মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়পরিজন, প্রিয়জন অথবা স্বজন। আছে শুধু অজানা একটি সুন্দর দেশ। যে দেশের টাকার মান আমাদের দেশের টাকার মানের চেয়ে অনেক বেশি। অজানা দেশটির একটি টাকা আমাদের দেশে পাঠালে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। কিছুদিনের মধ্যে আমার পরিবার একটি উন্নত পরিবারে পরিণত হবে। দেশের লোকেরা আঙুল তুলে বলবে ওই বাড়িটি অমি সাহেবের। সে বিদেশে থাকে, মস্ত বড় ব্যবসা বা চাকরি করে। আমাদেরও ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠাতে হবে। শুরু হয় আবার একটি নতুন স্বপ্ন বুননের খেলা।

বিদেশে থেকে অর্থ উপার্জন করে টাকা পাঠালে দেশের বাড়িতে ধনী হওয়া যায়। কিন্তু কেউ কি জানেন, কী একটা না বলা যন্ত্রণা নিয়ে আমরা প্রবাসে জীবন কাটাই। কেউ কি জানে আমাদের বুকের মধ্যে কীসের বেদনা নিত্য আমাদের আহত করে চলছে? কেউ কি খবর রাখেন আমাদের জীবনযাপনের মানদণ্ড কতটা নিম্নমানের। কেউ জানেন না, আমাদের বেদনা, আমাদের কান্না, আমাদের কষ্ট ও পাওয়া না পাওয়ার হিসাব-নিকাশ। আমরা নিত্যই বিভিন্ন না বলা অমানবিক যন্ত্রণার মধ্যে জীবনযাপন করে থাকি। অবিরাম বিশ্রামহীন অমানবিক পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠাই। কিন্তু আমাদের কষ্ট কাউকে বলতে পারি না। নিদারুণ কষ্টের মধ্যেও দেশ থেকে প্রিয়জনদের ফোন এলে, সকল কষ্ট বুকের মধ্যে চাপা দিয়ে মেকি হাসির ভান করে মিষ্টি সুরে বলে থাকি, আমি খুব ভালো আছি। এই দেশটা খুব ভালো। তোমরা কি জান, এই দেশের মানুষের মতো মানুষ পৃথিবীতে আর নেই। তারা কত দয়ালু, কত মহৎ ইত্যাদি! অথচ একটু আগেই এই দেশের মানুষের হাতে হতে হয়েছে নিগৃহীত, লাঞ্ছিত ও নিষ্পেষিত। প্রিয়জনদের মুখে হাসি ধরে রাখার জন্য ভালো থাকার অভিনয় করে কত সুন্দরভাবে গোছানো মিথ্যা কথা বলতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত, হায়রে আমার প্রবাসজীবন!

আমরা বিদেশে বসে অনেকেই একবেলা ভাত খাই। একটু ভালো পরিবেশে থাকি না। একটি ভালো কাপড় পরি না। একটি ভালো হোটেলে গিয়ে খাই না। আপনজন, প্রিয়-মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ওই টাকা জমিয়ে দেশে পাঠাই। সান্ত্বনা দিই এই বলে, আমার একার জীবনের জন্য যদি পরিবারের বাকি সবাই ভালো থাকে, তবে সকলের জন্য আমার জীবনের সকল সুখ, আনন্দ, হাসি ও স্বপ্নকে কোরবানি দিলাম। এ ছাড়া আমরা কী আর করতে পারি অথবা কী বলেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারি? মা-বাবা, প্রিয়জনেরা যখন জানতে চান, আজ কি খেয়েছ? উত্তরে আবার সেই মিথ্যা অভিনয়। কী যে বলো, এ দেশ কী তোমাদের মতো। এ দেশের মানুষেরা বাড়িতে রান্না করে কম। রাস্তায় বা হোটেলে খায়। খাবারের কী অভাব। অথচ এই আমি দেশে বসে অনেক বড় বড় রেস্টুরেন্টে খেতে যেতাম। কিন্তু এখানে একটি ডলার খরচের ভয়ে কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাই না। বাজারের সবচেয়ে কম মূল্যের জিনিসটি নিজের জন্য খুঁজি। কী যে বেদনা কাউকে বলতে পারি না!

আমাদের দেশের অনেক ভাইয়েরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এসে কেউ ইট ভাঙার কাজ, কেউ হাঁড়ি-পাতিল ধোয়ার কাজ, কেউ রান্নাবান্নার কাজ, কেউ সবজি বেচাকেনার কাজ, কেউ মাংস কাটার কাজ, কেউ বাড়ি-ঘর বা অফিস আদালত ধোয়ামোছা বা পরিষ্কার করার কাজ, আবার কেউ ট্যাক্সি চালানোর মতো কঠিন কাজ করে অর্থ উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তাদের বুকের মধ্যে যে বোবা কান্না তা তারা কোনো দিনই প্রকাশ করতে পারছেন না। অনেকেই বহু দিন ধরে বিদেশে থেকে থেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এখন তারা আর দেশে ফিরে যেতে চান না। তারা বিদেশেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাই তারা একটি সিটিজেন নামক কাগজ পাওয়ার আশায় দিনের পর দিন প্রতীক্ষা করছেন। তাদের জীবনের সব হাসিকান্না ওই একটি কাগজের মধ্যে লুকিয়ে আছে। তারা মনে করেন, নিজের জীবনের সব আনন্দ-বেদনার বলিদানের ফল হিসেবে আগামী প্রজন্মের জন্য সিটিজেন নামক একটি দলিল অর্জন করার চেয়ে আর কী সফলতা হতে পারে? কিন্তু এই দলিলের মধ্যে যে বেদনা, কষ্ট, না পাওয়ার যন্ত্রণা, অনেক প্রিয়জন ও কাছের মানুষ হারানোর অসহ্য কান্নার অশ্রু জল মিশ্রিত আছে তা হয়তো কোনো দিনই কেউ জানতে চাইবেন না।

আমাদের অনেকেই আছি যারা আমাদের অতি প্রিয়জন, এমনকি মা-বাবা মারা গেলেও সন্তান হিসেবে লাশটি কাঁধে করে কবর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ছোটবেলায় বাবামার কোলে-কাঁধে ওঠার এতটুকু দায় পরিশোধ করার সুযোগটুকুও পাই না। আবার কখনো কখনো শেষ দেখাটি করতে দেশে যেতে পারি না। কী যে বুক ভাঙা কষ্ট। কাউকে বলতে পারি না। আবার যখন সারা দিন আধা পেট খেয়ে কঠোর পরিশ্রম করে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরি, যখন শরীর আর চলে না, শ্রান্তি এসে চোখের দুই পাতা বুজে দিয়ে ঘুমের কোলে আশ্রয় নিতে চায়, তখন মনে পড়ে মায়ের কথা, প্রিয়জনদের কথা—আহা! এখন যদি মা অথবা প্রিয় বোনটি অথবা যদি প্রিয় স্ত্রী-সন্তান কাছে থাকত, তাহলে হয়তো আদর করে বলত, হাত-মুখ ধুয়ে আসো, গরম-গরম খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। বেশি ক্লান্তি মনে হলে কাল আর কাজে যেতে হবে না, আমাদের বেশি টাকার দরকার নেই। কী যে মধুর সান্ত্বনা বাক্য। যা সারা দিনের সকল কষ্টকে নিমেষেই দূর করে দেয়।

কিন্তু সুদূর এই প্রবাসে কেউ নেই একটু আদর করে কথা বলার বা শোনার। কী যে যন্ত্রণা। কাউকে বোঝানো যায় না। আবার যখন এই আমিই দেশে ফিরে যাই, সবাই মনে করেন টাকার ব্যাংক নিয়ে এসেছি। যে যার মতো বায়না ধরেন। টাকা দিতে না পারলে, সবাই ভুল বোঝেন। কাউকে বলা যায় না, বাড়তি আয় করা যায় না, আমার সাধ্য সীমিত। তখন সবার মুখে হাসি ফোটাতে না পারার যন্ত্রণাটা আবার বুকের মধ্যে জেগে ওঠে।

কিছুদিন দেশে থাকলে সকলে প্রশ্ন করেন, কীরে কত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিস? কবে ফিরে যাবি? শুধুমাত্র মা বলেন, খোকা আর ফিরে না গেলে হয় না অথবা আর কিছুদিন আমার কাছে থাক। অন্যরা বলেন, এবার বিদেশে গিয়ে আমার জন্য এটা পাঠাবে, ওটা পাঠাবে ইত্যাদি।

কেউ জানতে চান না আমাদের মনের কথা। আমরা তো আরও কিছুদিন প্রিয়জনদের কাছে থাকতে চাই। আমরা একটু প্রিয়জনদের আদর-ভালোবাসা পেতে চাই। জন্মভূমির মাটির মমতা চাই। সকালের শিশিরে পা ভিজিয়ে চেনা পথগুলোতে আবার একটু হাঁটতে চাই। কিন্তু কেউ আমাদের বুঝতে চান না। আমাদের বোবা মন আবার কান্নায় ভরে ওঠে। আমাদের আজ কোথাও কোনো স্বস্তি নেই। কোথাও আমাদের আপনজন নেই। আমরা সব জায়গাতেই প্রবাসী। আমাদের বোবা কান্নাগুলো কেউ দেখতে পারেন না। আমাদের হৃদয়ের ভেতরে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা ক্রমাগত বেড়েই চলছে। কোথায় যেন ছোটবেলার সেই স্বপ্নটা হারিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে ওই স্বপ্নটা আমাদের সারা জীবন না বলা বোবা কান্নায় শেষ করে দেবে।

হায়রে স্বপ্ন...তুমি আমাকে করেছ টাকা অর্জনের মেশিন যার হৃদয়ে অবিরাম কষ্টের সীমাহীন বোবা কান্না বহমান, চলছে অবিরত...।

পল সি মধু: সিডনি, অস্ট্রেলিয়া।

শেয়ার করুন

0 comments: