বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৬, ২০১৮

দলীয় কোন্দল ও জামায়াতের প্রার্থী নিয়ে বিপাকে আরিফ


সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে এবার বিএনপির অবস্থা অনেকটাই কোণঠাসা। এর প্রধান কারণ ভোটের মাঠে ২০ দলীয় জোটের মিত্র জামায়াতের মেয়রপ্রার্থীর সরব উপস্থিতি। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা শত চেষ্টা করেও জামায়াতের প্রার্থীকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরাতে পারেননি। ফলে নগরীর একটি বড় ভোটব্যাংক বিএনপির পক্ষে নেই।

এদিকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিমকে নানাবিধ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেয়ার পর সেলিম ও তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারাও আরিফুলের বিপক্ষে শক্তভাবে অবস্থান নেবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে নিজ দলের কিছু সংখ্যক নেতাকর্মীর মধ্যেও আরিফুল হককে নিয়ে বিরোধিতা রয়েছে। তা ছাড়া নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে দলীয় নেতাকর্মীরা গ্রেফতার ও হয়রানির শিকার হওয়ায় আরিফের প্রচারণায় ব্যাঘাত ঘটছে। তবে এসব কিছুর পরও বিএনপির নেতাকর্মীরা জয়ের আশা ছাড়েননি। নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরার পাশাপাশি নৌকার প্রার্থী কামরানের বিরোধীদের পুঁজি করেই সিলেটে জয়ী হতে চায় বিএনপি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট বিএনপির দুর্গে এখনো অনৈক্যের সুর বাজছে। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিমের সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন নিয়েই মূলত কোন্দলের সূত্রপাত হয় আরিফুল হক চৌধুরীর। কিন্তু বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা শুরুতে এ বিরোধ মেটাতে ব্যর্থ হন। এর ফলে বিদ্রোহী প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান। অবশ্য অনেক তিক্ততার মধ্য দিয়ে চাপের মুখে সেলিম নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন।

এতে তৎক্ষণাৎ সমস্যা দূর হয়েছে বলে মনে করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে সেলিম একেবারেই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। এখন পর্যন্ত দলীয় মেয়রপ্রার্থী আরিফুল হকের কোনো প্রচারণায় অংশ নেননি তিনি। তা ছাড়া সেলিমের কর্মী-সমর্থকদের বুকের আগুন এখনো নেভেনি। তারা সামনে কিছু বলতে না পারলেও ভোটের দিন এর জবাব দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। এটা আরিফের জন্য ‘ফ্যাক্টর’ হবে বলে ধারণা করছেন অনেকে।

অন্যদিকে সিসিক নির্বাচনে জামায়াতের মেয়রপ্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ধানের শীষের প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিমকে ভোটের মাঠ থেকে সরাতে পারলেও ‘জোটের বিদ্রোহী প্রার্থী’ জুবায়ের এখনো বীরদর্পে বহাল আছেন। অবশ্য আরিফের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ধারণা, নির্বাচনের আগ মুহূর্তে হলেও জুবায়ের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেবেন।

যদি তা না হয় তাহলে আরিফকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত জুবায়েরের সরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। গত নির্বাচনে জামায়াতের কোনো প্রার্থী না থাকায় তাদের সব ভোট পেয়েছিলেন জোটের প্রার্থী আরিফ। কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। ফলে নির্বাচনে জিততে হলে সিলেটের অ্যান্টি আওয়ামী লীগ ভোট, আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল ও কামরানবিরোধীদের পুঁজি করেই এগোতে হবে আরিফকে।

তবে ভোটের মাঠে জামায়াত প্রার্থীকে নিয়ে বিএনপি বেশ বিপাকে পড়লেও দলের নেতাকর্মীরা তা মুখে স্বীকার করছেন না। সিলেট জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরীর দাবি, সিটি নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী থাকায় বিএনপি বেশি সুবিধা পাবে। কেননা আরিফুল হক চৌধুরী মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নগরীর অনেক উন্নয়ন করেছেন। এতে জনগণ উপকৃত হয়েছে। তাই উন্নয়নপ্রত্যাশী জনগণ আবারো তাকেই ভোট দেবে। তা ছাড়া জামায়াতবিরোধীদের ভোটও আরিফের বাক্সে পড়বে।

এদিকে জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ মুহূর্তে জুবায়েরের নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিএনপির অনুরোধ নিয়ে জামায়াতের বিকল্প ভাবনাও নেই। সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবেন।

সিলেট বিএনপির ভেতরেও কয়েকটি গ্রুপ প্রকাশ্যেই আরিফের বিরোধিতা করছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হাসান কায়েস লোদী ও তার সমর্থকরা আরিফের বিপক্ষে কাজ করছেন বলে প্রচার রয়েছে। অবশ্য কায়েস লোদী এই অভিযোগ এড়িয়ে গেছেন। তিনি জানান, এবারের সিটি নির্বাচনে তিনি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। তাই নিজের প্রচারণায় ব্যস্ত থাকায় ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামতে পারেননি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-স্বেচ্ছাসেবক সম্পাদক শামসুজ্জামান জামান সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী। গুঞ্জন রয়েছে, আরিফের পক্ষে কাজ না করতে নিজের অনুসারীদের গোপনে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে মাসখানেক আগে সিলেট জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা নিয়ে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে ৯ জন পদধারী নেতা পদত্যাগ করেন। তাদের ঢাকায় তলব করে কোনো সমাধান দিতে না পারলেও আপাতত নির্বাচনী মাঠে ধানের শীষের পক্ষে কাজ চালিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি। এরপর ছাত্রদলের ওই বিদ্রোহী গ্রুপটি প্রকাশ্যে বিরোধিতা থেকে সরে এলেও দলীয় মেয়রপ্রার্থীর প্রচার-প্রচারণায় এখনো সক্রিয় হয়নি।

দলের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে চিন্তিত হলেও সিলেট বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা আশা করছেন, ভোটের সময় যত কাছাকাছি আসবে, বিরোধিতা ততই কমে আসবে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ ভোরের কাগজকে বলেন, শুরুতে মান-অভিমানের কারণে অনেক নেতাকর্মী আরিফুল হক চৌধুরীর বিপক্ষে থাকলেও এখন আর নেই।

বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা কঠোর বার্তা পেয়ে সবাই একজোট হয়ে আরিফের পক্ষে কাজ করছে। জোটের শরিক দল জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে নির্বাচন থেকে নিবৃত্ত করতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা এখনো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি আশা করছি, আগামী ৩০ তারিখের নির্বাচনে আরিফুল হক চৌধুরী ২০ দলীয় জোটের একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকবেন।

আর আরিফুল হক চৌধুরীর দাবি, দলের ভেতরে কোনো কোন্দল নেই। বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ধানের শীষের জয়ের জন্য সবাই কাজ করছেন।

শেয়ার করুন

0 comments: