মঙ্গলবার, জুলাই ৩১, ২০১৮

মূল আরবি সংযুক্তি ব্যতীত কোরআনের অনুবাদ প্রকাশ ও বিক্রি করা হারাম

মুফতি মাহমুদ হাসানঃ


কোরআন শরিফের শব্দ ও মর্ম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ থেকে আজ অবধি হুবহু সংরক্ষিত রয়েছে। পৃথিবীতে কোরআন সংরক্ষণের এ ধারা আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের মাধ্যমেই চালু রেখেছেন। কোরআন শরিফের শব্দ ও মর্ম সংরক্ষণের জন্য সার্বিক প্রচেষ্টার ধারা অব্যাহত রাখা মুসলমানদের জন্য ফরজে কেফায়া। এ ফরজে কেফায়া পালনার্থে যুগে যুগে সব ভাষাভাষী মুসলিমের মধ্যে কোরআনের শব্দ ও মর্ম শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে তার অনুবাদ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ সংকলনের ধারাও অব্যাহত রয়েছে। ইনশাআল্লাহ কিয়ামত অবধি থাকবে। আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কোরআনের অনুবাদ এবং যেকোনো ভাষায় ব্যাখ্যা সংকলনের একটি মৌলিক বিধান হলো, অনুবাদ ও ব্যাখ্যার সঙ্গে মূলপাঠ উদ্ধৃত থাকতে হবে। এ ধারা ইসলামের স্বর্ণযুগ থেকে নিয়ে আজ অবধি চালু রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, কেউ কেউ না জেনে এর ব্যতিক্রম শুরু করেছে। নিম্নে আমরা এর বিস্তারিত বিধান আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

মূল আরবি ব্যতীত অনুবাদ ছাপানো

কোরআন শরিফের মূল আরবি ব্যতীত অনুবাদ লেখা, ছাপানো বা প্রচার করা মুফতিদের সর্বসম্মতিক্রমে হারাম ও অবৈধ। এ ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবসহ সব মাজহাবের ইমামদের ঐকমত্য রয়েছে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ : ২/১০৪)

এর কারণ হলো, মূল আরবি ছাড়া অনুবাদ প্রচারের দ্বারা অনেক ধরনের ফিতনা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ হলো—

এক. যেহেতু কোরআন শরিফের শব্দ ও মর্ম উভয়টিই মুজেজা বা ঐশী ও অলৌকিক; তাই এর মূল আরবির অলৌকিক পাঠ বাদ দিয়ে মানুষের কৃত শুধু অনুবাদকে কোরআন বলে প্রচার করা জঘন্য অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আরবি কোরআন নাজিল করেছি।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১)

মানুষের কৃত শুধু অনুবাদ কখনো অলৌকিক পাঠ ও তার সমকক্ষ হতে পারে না। অনুবাদকের ভিন্নতায় অনুবাদও ভিন্ন হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে যেকোনো একটিকে কোরআন বলা অন্যটিকে অস্বীকারের শামিল। কিন্তু অনুবাদের আগে যদি আরবি পাঠ থাকে, তাহলে এ সমস্যা থাকে না। 

দুই. এতে কোরআন শরিফের মর্মে ধীরে ধীরে বিকৃতি আসার প্রবল আশঙ্কা। অথচ কোরআন শরিফের শব্দ, অর্থ, ব্যাখ্যা—সব কিছুর সঠিক সংরক্ষণ উম্মতের সবার ওপর জরুরি। তাই মূল আরবি পাঠ সঙ্গে থাকলে তা শুধরে নেওয়া যাবে, যা শুধু অনুবাদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

তিন. অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের বিকৃতি সাধনের এ-ও একটি কারণ যে তারা মূল পাঠ (টেক্সট) বাদ দিয়ে শুধু মর্ম প্রচার করত, এতে ধীরে বহুলাংশে বিকৃতি সাধিত হয়।

চার. কখনো কখনো অনেক মানুষ এর দ্বারা কোরআন শরিফের মূল পাঠ শিখতে অনাগ্রহী হবে। অথচ কোরআনের মূল আরবি শিক্ষা করাও ফরজ। অধিক হারে কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বতন্ত্র ইবাদত।

পাঁচ. ইসলামবিদ্বেষী ও কোরআনবিরোধীচক্র এর দ্বারা ফায়দা লুটবে। নিজেদের মনগড়া অনুবাদ করে বাজারে ছাড়বে এবং এর দ্বারা জনসাধারণ বিভ্রান্ত হবে। অথচ মূল পাঠ সঙ্গে থাকলে এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াতে পারবে না। (দেখুন : জাওয়াহিরুল ফিকহ ২/১০৫-১২৭)

এ জন্যই যুগে যুগে আলেমরা তা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হানাফি মাজহাবের বিদগ্ধ ফকিহ ইমাম বুরহানুদ্দিন মুরগিনানি, ইবনুল হুমাম, জালালুদ্দিন খাওয়ারিজমি, আলাউদ্দিন হাসকাফি, শুরুনবুলালি, ইবনে আবেদিন শামি, আশরাফ আলী থানভী, মুফতি শফি; শাফেয়ি মাজহাবের আল্লামা জারকাশি, ইবনে হজর আসকালানি, হাফেজ সাখাবি; হাম্বলি মাজহাবের আল্লামা ইবনে কুদামা রহমাতুল্লাহি আলাইহিম প্রমুখ নিজ নিজ কিতাবে তা উল্লেখ করেছেন। (দেখুন : ফাতহুল কাদির ১/২৮৬, আলকিফায়া ১/২৪৯, আলমুগনি ১/৫৩০, আন্নাফহাতুল কুদসিয়া পৃষ্ঠা ৩৫, রদ্দুল মুহতার ১/৪৫৫, জাওয়াহিরুল ফিকহ ২/১০৩-১২৯), এমনকি আল্লামা শুরুনবুলালি (রহ.) এ বিষয়ে ‘আন্নাফহাতুল কুদসিয়া’ নামক স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করে এর অবৈধতা প্রমাণ করেছেন।

আরবি ব্যতীত কোরআনের অনুবাদগ্রন্থ ক্রয়-বিক্রয়

যেহেতু তা লেখা ও ছাপানো অবৈধ, তাই অবৈধ কাজের সহযোগিতা বিধায় এরূপ অনুবাদগ্রন্থ ক্রয়-বিক্রয় করাও নিষিদ্ধ। কেননা এতে ওই অবৈধ কাজের সহযোগিতা হয়ে থাকে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ ২/১০৪) কোরআনে কারিমে রয়েছে, ‘যে ব্যক্তি খারাপ কাজের সুপারিশ করবে, ওই গুনাহর অংশ সুপারিশকারীও পাবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৫)

দু-এক আয়াত আরবি ব্যতীত উল্লেখের অনুমতি

তবে হ্যাঁ, উদ্ধৃতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দু-একটি আয়াতের আরবি ব্যতীত শুধু অনুবাদ লেখা বৈধ। যেহেতু এ পরিমাণের কারণে উল্লিখিত ক্ষতিগুলোর আশঙ্কা নেই। তবে পূর্ণ কোরআন বা উল্লেখযোগ্য বিরাট অংশের শুধু অনুবাদ লেখা অবৈধ। (ফাতহুল কাদির : ১/২৮৬, রদ্দুল মুহতার : ১/৪৫৩)

অতএব, মুসলমানদের জন্য আবশ্যক, তারা যেন বৈধ পদ্ধতিতে এহেন অপকর্ম বন্ধের চেষ্টা করে এবং যেসব লেখক ও প্রকাশক এ কাজে জড়িত, তাদের প্রতিরোধ করে।

বাংলা উচ্চারণে কোরআন লেখা ও তা পড়া নাজায়েজ

বর্তমানে অনেক লোককে দেখা যায়, তারা বাংলা উচ্চারণ দেখে এর অনুরূপ কোরআন পাঠ করে থাকেন, অথচ আরবি ব্যতীত অন্য ভাষায় কোরআনের সঠিক উচ্চারণ অসম্ভব। তাই কোরআন শরিফকে অন্য ভাষায় লেখা বা পড়া উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে নাজায়েজ। এতে কোরআনের শব্দ ও অর্থ বিকৃত হয়ে যায়, যা সম্পূর্ণ হারাম। তাই কোনো আলেমের তত্ত্বাবধানে কোরআন শিখে নিতে হবে। (আল ইতক্বান : ৮৩০-৮৩১, ইমদাদুল আহকাম : ১/২৪০, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ১/৪৩, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ২/৯৫)

শুধু তা-ই নয়, এমনকি আরবি ভাষা ঠিক রেখেও কোরআন শরিফের বিশেষ রসমুল খত তথা লেখারীতির বিপরীত লেখাও ইমামদের ভাষ্যমতে নিষিদ্ধ। (ফাজায়েলুল কোরআন, ইবনে কাসির : ৫০, আল ইতক্বান : ৮৩০-৮৩১, আননুসুসুল জালিয়্যাহ : ২৫)

বাংলা বা যেকোনো অনারবি ভাষায় কোরআনের উচ্চারণ লেখার আরেকটি ক্ষতিকর দিক হলো, এর দ্বারা মানুষ সঠিকভাবে কোরআন না শিখে শুধু উচ্চারণনির্ভর ভুল কোরআন পাঠে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। অথচ প্রত্যেক নর-নারীর ওপর কোরআন এতটুকু সহিহ-শুদ্ধ করে পড়া ফরজে আইন, যার দ্বারা অর্থ পরিবর্তন হয় না। অর্থ পরিবর্তন হয় এমন ভুল পড়ার দ্বারা নামাজ নষ্ট হয়ে যায়। অতএব, কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য যে সুরাগুলো প্রয়োজন, সেগুলো শুদ্ধ করে নেওয়া আবশ্যক, অন্যথায় সে গুনাহগার হবে। আর পূর্ণ কোরআন শুদ্ধভাবে শেখা সবার ওপর সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ও ফরজে কেফায়া। অর্থাৎ প্রত্যেক এলাকায় পূর্ণ কোরআন শুদ্ধভাবে পাঠকারী একটি দল থাকা আবশ্যক। (মুকাদ্দামায়ে জাযারিয়া : ১১, মাআরেফুল কোরআন : ৪/৪৮৯)

আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যারা সহিহ-শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত করে, তারা নেককার সম্মানিত ফেরেশতাদের সমতুল্য মর্যাদা পাবে এবং যারা কষ্ট সত্ত্বেও কোরআন সহিহ-শুদ্ধভাবে পড়ার চেষ্টা ও মেহনত চালিয়ে যায়, তাদের জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৪৫৪)

লেখক : ফতোয়া গবেষক ও মুহাদ্দিস

শেয়ার করুন

0 comments: