বুধবার, জুলাই ২৫, ২০১৮

প্রবীণ ত্বক থাকুক নবীন

আপনার উজ্জ্বল ত্বক নিয়ে আপনি একসময় গর্ব করতেন। এরই মাঝে পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। আপনার ত্বকে দেখা দিয়ে বলিরেখা। ত্বকের আরও কী কী সমস্যা হতে পারে, ভেবে আপনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কিংবা চিন্তিত আপনার বাহু বা হাতে নতুন তৈরি হওয়া বাদামি দাগগুলো নিয়ে।

আসলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে পরিবর্তন আসে। ত্বক আগের চেয়ে পাতলা হয়, ত্বকে থাকা চর্বির পরিমাণ কমে যায়। যে কারণে ত্বককে আগের মতো দৃঢ় এবং মসৃণ মনে হয় না। খুব সহজেই ত্বকের নিচে থাকা শিরা-উপশিরা নজরে পড়ে। কেটে গেলে, ছিঁড়ে গেলে বা আঘাত পেলে তা সারতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগছে। বছরের পর বছর ত্বকে সূর্যকিরণ পড়ার কারণে ত্বকের বলিরেখা, শুষ্কতা, গোল গোল দাগ, এমনকি ত্বকের ক্যানসারও হতে পারে। কিন্তু আপনি আপনার ত্বককে রক্ষা করার জন্য বেশ কিছু কাজ করতে পারেন।

ত্বকের শুষ্কতা ও চুলকানি
অনেক প্রবীণ আছেন, যাঁরা ত্বকে শুষ্ক দাগের সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে পা, কনুই বা হাতের নিচের অংশে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। শুষ্ক ত্বকে খসখসে এবং আঁশের মতো অনুভূতি হয়। ত্বকের এ ধরনের শুষ্কতার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পান না করা, দীর্ঘ সময়ের জন্য সূর্যকিরণের সংস্পর্শে আসা, ধূমপান করা ও উদ্বিগ্ন থাকা। ঘর্ম ও তৈলগ্রন্থি কমতে থাকা, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি স্বাভাবিক ঘটনা।

কিছু কিছু স্বাস্থ্যসমস্যা যেমন ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের কারণেও ত্বকের শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার, সুগন্ধি মাখা এবং বেশি গরম পানিতে গোসল করা আপনার ত্বকের শুষ্কতাকে আরও ভোগান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

অন্য রোগের জন্য খাচ্ছেন এমন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ত্বকে চুলকানি হতে পারে। প্রবীণদের ত্বক পাতলা হয়ে যায় বলে চুলকানির কারণে রক্ত ঝরতে পারে, যা ইনফেকশন তৈরি করতে পারে। আপনার ত্বক যদি অতিরিক্ত শুষ্ক হয় এবং চুলকানির সমস্যা থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ত্বকের শুষ্কতা এবং চুলকানির জন্য
ত্বককে আর্দ্র রাখতে লোশন, ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করুন
বেশি গরম পানির পরিবর্তে কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করুন
শীতকালে রুম হিটার ব্যবহারের কারণে বাতাসের শুষ্কতা বেড়ে যায় বলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন।

কালশিটে দাগ
তরুণদের তুলনায় প্রবীণদের ত্বকে কালশিটে পড়ার ঘটনা বেশি ঘটে, যা সারতে লম্বা সময় লাগতে পারে। কিছু কিছু রোগ এবং ওষুধ ব্যবহারের কারণেও এই কালশিটে পড়তে পারে। শরীরের কোথাও বিশেষ করে কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে এমন স্থানে যদি কালশিটে পড়ে, যার কারণ আপনার জানা নেই তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

বলিরেখা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে বলিরেখা পড়তে শুরু করে। পরিবেশে থাকা সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের নমনীয়তা কমিয়ে দিতে পারে। ধূমপানের অভ্যাসও বলিরেখার জন্য দায়ী। বলিরেখা দূর করার বাহারি বিজ্ঞাপন আপনার নজরে পড়তে পারে, যার অধিকাংশই কাজ করে না। কিছু কিছু পদ্ধতি ব্যথাযুক্ত এবং বিপজ্জনকও বটে, যা চিকিৎসক ছাড়া অন্য কারও করা উচিত না। আপনি যদি বলিরেখা নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন, তাহলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।

ত্বকে দাগ ও আঁচিল
ত্বকে স্পট বা দাগ যা আগে ‘লিভার স্পট’ নামে পরিচিত ছিল, আসলে দীর্ঘদিন সূর্যকিরণের সংস্পর্শে আসার কারণে হয়ে থাকে। এগুলো সাধারণত মুখ, বাহু, হাত, পিঠ বা পায়ে দেখা যায়। সূর্যকিরণ থেকে বাঁচার জন্য সানস্ক্রিন ব্যবহার উপকারে আসতে পারে।

আঁচিল ত্বকের একধরনের বেড়ে ওঠা, যার রং ত্বকের রঙের মতোই। প্রবীণ, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে আঁচিল বেশি হয়। চোখের পাতা, ঘাড়, বগলের নিচ, বুক বা কুঁচকিতে সাধারণত আঁচিল বেশি হতে দেখা যায়।

ত্বকের দাগ বা আঁচিল থেকে ক্ষতির কোনো হুমকি নেই, যদিও আঁচিল কখনো কখনো বিরক্তির কারণ হতে পারে। আপনি যদি ত্বকের দাগ বা আঁচিল নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন, তাহলে চিকিৎসকের সাহায্য নিয়ে এগুলো দূর করতে পারেন।

ত্বকের ক্যানসার
গায়ের রং যা-ই হোক না কেন, যে কেউই ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারে। তবে ফরসা ত্বকের মানুষদের যেহেতু ত্বকে সহজেই দাগ হয় তাই তাদের ত্বকের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি। শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার আগেই যদি টের পাওয়া যায় যে ত্বকে ক্যানসার হয়েছে, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সারিয়ে ফেলা সম্ভব।

ত্বকের তিন ধরনের ক্যানসার পাওয়া যায়। এর মধ্যে দুটি (ব্যাসাল সেল ক্যানসার ও স্কোয়ামাস সেল ক্যানসার) খুব ধীরগতিতে বাড়ে বা কদাচিৎ শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়ায়। শরীরের যেকোনো স্থানে এই দুই ধরনের ত্বকের ক্যানসার হতে পারে, যদিও তা সাধারণত শরীরের যে অংশ উন্মুক্ত থাকার ফলে সূর্যকিরণের সংস্পর্শে আসে যেমন মাথা, মুখ, ঘাড়, বাহু বা হাত এসব জায়গায় বেশি হয়। তৃতীয় ধরনের ত্বকের ক্যানসারটিই (মেলানোমা) সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। এ ধরনের ক্যানসার তুলনামূলক কম হলেও তা দ্রুত শরীরের অন্য অংশে ছড়ায় এবং মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আপনার ত্বকে ক্যানসার হলো কি না, বোঝার জন্য প্রতি মাসেই নিয়ম করে ত্বক পরীক্ষা করানো উচিত। ত্বকের ক্যানসার সাধারণত ব্যথাবিহীন হয়ে থাকে। লক্ষ রাখুন, আপনার ত্বকে নতুন কোনো অনভিপ্রেত বৃদ্ধির ঘটনা ঘটল কি না, ত্বকে কোনো ক্ষত আছে কি না, যা সারছে না বা কোনো তিল থেকে রক্ত পড়ছে কি না।

ত্বকের ক্যানসার বোঝার জন্য তিল, জন্মচিহ্ন বা ত্বকের অন্য অংশের দিকে খেয়াল রাখুন—
এক ভাগের সঙ্গে অন্য ভাগের বৈসাদৃশ্য আছে কি না
চারপাশটা অসমান কি না
রং বদলাচ্ছে কি না, বা একাধিক রঙের উপস্থিতি আছে কি না
আকার পেনসিল ইরেজারের চেয়ে বড় কি না
আকার-আকৃতি বদলাচ্ছে কি না
চুলকানি বা ব্যথা হচ্ছে কি না
রক্ত ঝরছে কি না

ওপরের যেকোনো একটিও যদি থাকে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান এবং নিশ্চিত হন, তা ক্যানসার কি না।

ত্বককে সুস্থ রাখুন
আপনার ত্বকের জন্য কিছুটা সূর্যকিরণ উপকারী, তবে সচেতন থাকুন। সূর্যকিরণের নিচে থাকার সময় কমিয়ে আনুন দিনের বেলা বাইরে যাওয়া ঠিক আছে, কিন্তু সূর্যকিরণ যখন সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে পড়ে তখন সূর্যের আলোর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। যেমন গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সূর্যকিরণ এড়িয়ে চলুন। মেঘলা আকাশ দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। সূর্যকিরণ মেঘ ভেদ করে যেতে পারে। আপনি পানিতে থাকলেও সাবধানে থাকবেন। কারণ, সূর্যকিরণ পানি ভেদ করে আপনার ত্বক পুড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন
বাইরে যাওয়ার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে ত্বকে সানস্ক্রিন লাগিয়ে নিন। যদি দীর্ঘ সময় সূর্যালোকে থাকেন, তাহলে প্রতি দুই ঘণ্টায় একবার সানস্ক্রিন লাগান। আপনি যদি সাঁতার কাটেন, অতিরিক্ত ঘামেন বা বারবার তোয়ালে দিয়ে ত্বক মোছেন তাহলে আরও ঘনঘন সানস্ক্রিন লাগাবেন।

ত্বক রক্ষা করতে পারে, এমন পোশাক পরুন
আপনাকে যদি দীর্ঘ সময় সূর্যকিরণের নিচে থাকতে হয় তাহলে ঢিলেঢালা, হালকা, ফুলহাতা শার্ট এবং ফুলপ্যান্ট পরুন। সূর্যকিরণকে ৯৯ থেকে ১০০ ভাগ ঠেকাতে পারে, এমন সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
মনে রাখবেন, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আপনার ত্বকের পরিবর্তন হবে। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস মনে রাখলে ত্বকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন। মাঝেমধ্যেই আপনার ত্বক পরীক্ষা করুন। উদ্বিগ্ন হয়ার মতো কোনো পরিবর্তন চোখে পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডা. রোমেন রায়হান
সহকারী অধ্যাপক
পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

0 comments: