বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৬, ২০১৮

জীবন কথন, কোথা থেকে আমার এই অস্তিত্ব? আমার এই অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী? আমার গন্তব্য কোথায়?


বিসমিল্লাহির রহমানির রহিমঃ
তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর এই সভ্যতায় আমাদের জীবনযাত্রা, আমাদের বেড়ে ওঠা। জীবন পরিচালনায় আমরা পশ্চিমা সংস্কৃতি, পশ্চিমা মানসিকতা, ধর্ম ও নৈতিকতা বিবর্জিত পশ্চিমা জীবনদর্শন যত বেশি নিজেদের জীবনে অনুকরণ করতে পারি, ততই নিজেদের আরো সভ্য, আরো ‘স্মার্ট’, আরো ‘সিভিলাইজড’ ভাবা শুরু করি। পরাজিত মানসিকতার এই আমরা যেন কোনো এক অজানা উদ্ভট কারণে ধরেই নিয়েছি যে, পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি-জীবনদর্শন অন্য সব জীবন ব্যবস্থার চেয়ে অনুসরণের অধিক উপযুক্ত। ধর্মহীন, বস্তুবাদী, সেক্যুলার সংস্কৃতির এই অন্ধ শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চিমাদের সাফল্য, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য দিয়ে অর্জিত হয়নি। হয়েছে সূক্ষ্ম এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে। যেখানে পশ্চিমা জীবনধারা অন্যান্য জীবনদর্শনগুলোকে পরাজিত করার আগেই তারা পরাজয় বরণ করে নিয়েছে। মিডিয়া, নিউজ পেপার, শোবিজ, ফ্যাশন, হলিউড, সিরিয়াল, লিটারেচার, এডুকেশন সিস্টেম ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের মনস্তত্ত্বে সেক্যুলার, বস্তুবাদী এই জীবনপদ্ধতি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

একজন স্কলার বলেছিলেন, জীবনদর্শনের ক্ষেত্রে আপনার নিজস্ব কোনো দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে আপনি অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হবেন এবং এক সময় ‘অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি’কেই সঠিক মনে করে সেটা অনুসরণ করে আপনার মূল্যবান জীবন এতে উৎসর্গ করে দেবেন।

আমরাও জেনে না জেনে, বুঝে না বুঝে আমাদের জীবন উৎসর্গ করেছি এমন এক জীবন দর্শনের অংশ হয়ে, যেটার না আছে কোনো অর্থ, না আছে কোনো গন্তব্য।

আপনার চৈতন্য (consciousness), জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিবেক রয়েছে বলেই আপনি অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে আলাদা, অন্য সৃষ্টিদের চেয়ে আপনি শ্রেষ্ঠ। আপনি মানুষ। মানুষ বলেই আপনি ন্যায়-অন্যায় বোঝেন। মানুষ বলেই আপনি খুন-ধর্ষণের বিচার চান। সামাজিক নিরাপত্তা, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা চান। স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার হন। রাস্তায় কিছু কুকুর একত্র হয়ে নিপীড়ন বিরোধী সমাবেশ করছে, এরকম কি কখনো হয়েছে? আপনি যে কুকুর বা ভেড়ার মতো শুধুই একটা প্রাণী না, বুঝতে পারছেন? আপনি অনন্য। আপনি মানুষ। মানুষ মাত্রই আপনাকে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন নিজেকে করতে হবে।

১. কোথা থেকে আমার এই অস্তিত্ব?
২. আমার এই অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী?
৩. আমার গন্তব্য কোথায়?

পশ্চিমা সেক্যুলার জীবন ধারার অনুসারী একজন বিজ্ঞানীকে এই প্রশ্নগুলো করুন, তিনি উত্তর দেবেন এভাবে –

১. শূন্য (?) থেকে।
২. কোনো উদ্দেশ্য নেই। আপনার উদ্দেশ্য আপনি নিজেই ঠিক করুন। ইচ্ছে হলে নারী-শিশু অপহরণ করে, এক দেশ থেকে অন্যদেশে পাচার করে পর্ন-ইন্ডাস্ট্রির মালিক হন, ইচ্ছে হলে পুঁজিপতি হয়ে সর্বস্ব লুট করুন। সেটাই আপনার জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলবে।
৩. জীবনের কোনো গন্তব্য নেই। মৃত্যুর সাথেই সব শেষ হয়ে যাবে।

পশিমা দর্শন আপনাকে এরকম অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন, গন্তব্যহীন, বেপরোয়া জীবন উপহার দিতে চায়। তার কাছে যেহেতু জীবনের কোনো গন্তব্য নেই, কোনো উদ্দেশ্য নেই এবং অস্তিত্বের কারণও তার আজানা, তাই তার কাছে এখন, এই মুহূর্তটাই সবকিছু। ক্ষণিকের ভালোলাগা, ভালো থাকাটাই তার কাছে ঈশ্বর। এর জন্য যদি ‘ইচ্ছে’ হয় ড্রাগ নিবে, পরিবারের সদস্যদের সাথে সেক্সুয়াল রিলেশনে জড়াবে, ‘ইচ্ছে’ হলে পুঁজির জোর খাটিয়ে গরীব দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করে যাবে। ‘ইচ্ছে’ হলেই কূট চালে ফাঁসিয়ে সম্পদ নিজের দেশে পাচার করে নিবে। ‘ইচ্ছে’ হলে দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ লাগিয়ে রাখবে শুধুমাত্র অস্ত্র ব্যবসাকে চাঙ্গা রাখার জন্য। কারো কিছু বলার নেই। কিছু করার নেই। ‘ইচ্ছে’টাই তাদের ঈশ্বর। এই ‘ইচ্ছে’টাই তাদের চালিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের উপর হুকুম চালায়। আর আপনার স্রষ্টা আল্লাহ্‌ বলছেন,

আর তুমি কি তাকে দেখেছো, যে নিজের খেয়াল-খুশিকে তার উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? [সূরাহ আল-ফুরকান (২৫):৪৪, সূরাহ আল-জাসিয়া (৪৫):২৩]

যেটুক মানবতার বুলি এরা মুখে আওড়ায়, তার সবটুকুই ফাঁকা বুলি। প্রমাণ চাই?

দেখুন, জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী ঘোষণার পর মার্কিন প্রতিনিধি বললেন, ইজরায়েল তাদের মতোই ‘হিউম্যান রাইটস’-এ বিশ্বাস করে। তাই আমেরিকা ও ইজরায়েল পরস্পর বন্ধু।

এই যদি হয় পশ্চিমা হিউম্যান রাইটস, ভেবে দেখুন একবার … এমন মানবাধিকার কি আপনি চান? ফিলিস্তিনি নিরীহ ভাই-বোনদের, নিরস্ত্র শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের লাশ ও রক্ত দিয়ে লেখা মানবাধিকার?

এই অশুভ জীবনদর্শন দ্বারা আমরা সবাই প্রভাবিত। বাঙালি শিক্ষিত সমাজ তাদের বিদ্যাবুদ্ধি সব বিকিয়ে দিয়েছে পশ্চিমা ধ্যান ধারণায়। তারা কী করে এই পশ্চিমা জীবন ধারার এত প্রসার কামনা করে? ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার আড়ালে যে সত্যটা লুকিয়ে আছে, সেটা হলো মানুষকে জীবনের গন্তব্য আর অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুলিয়ে রাখা। যেখানে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ দু’বেলা খাবার পায় না, ক্ষুধার যন্ত্রণায় শিশুরা ছটফট করতে থাকে, বিশ্বকাপে একটা ‘বল’ নিয়ে দৌড়াদৌড়ির জন্য সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় হয় কেন? ভেবে দেখেছেন? এই উত্তেজনা, এই উম্মাদনা আপনাদের কী দিয়েছে? পৃথিবীকে কী দিয়েছে!? চারদিকে যেন একটাই বার্তা – ভুলে থাকো। নিজের উদ্দেশ্য ভুলে থাকো। জীবনের শেষ গন্তব্য ভুলে থাকো। হেলায় ফেলায় জীবন কাটাও। বিনোদনের নামে আত্মবিধ্বংসী এই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অপচয়ে কি আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকাটির কোনো খনি থেকে পাচার হওয়া হিরা’র টাকা নেই? কৃত্রিম গৃহযুদ্ধে ক্ষুধার যাতনায়, মৃত্যুর যন্ত্রণায় কাতরানো শিশুর আর্তচিৎকার নেই?

পশ্চিমা দর্শনের মূল মন্ত্র – জীবনকে গন্তব্যহীন মনে করে এই ক্ষণিকের পার্থিব জীবনের সর্বোচ্চ সুখের আশায় নিজেকে তাড়িয়ে বেড়ানো। শুধু পার্থিব সুখের জন্য সময়, মেধা, শ্রম, মনুষ্যত্ব, বিবেক সবকিছু উৎসর্গ করা। এর ফলাফল – আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, নৈতিকতা বিবর্জিত ও জুলুমের উপর প্রতিষ্ঠিত একটা সমাজব্যবস্থা। যেখানে মানবিক মর্যাদার ছিটেফোঁটাও আর অবশিষ্ট নেই।

এবার আসুন, নতুন এক জীবন দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। এই জীবনধারা আপনাকে উপরের তিনটি মৌলিক প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দিতে সক্ষম।

১. আমাদের অস্তিত্ব এক পরম সত্ত্বা কর্তৃক সৃষ্ট। তিনিই সমস্ত কিছুকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন।

তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে কে অধিক সৎ কর্মশীল সেটা পরীক্ষা করতে পারেন। [সূরাহ আল-মুল্ক (৬৭):২]

২. আমাদের এই অস্তিত্বের উদ্দেশ্য তাঁর উপাসনার মাধ্যমে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তিনি সমগ্র সৃষ্টি জগতের মাঝে একমাত্র আমাদেরকেই প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যাতে আমরা তাঁর বিধানসমূহ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই মানবিক মর্যাদাপূর্ণ, উন্নত জীবনের অধিকারী হতে পারি। ন্যায়, সাম্য ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে পারি। তাঁর অনুশাসন মানার মধ্যেই ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির মূলমন্ত্র নিহিত।

৩. মৃত্যুর পর আমাদের জীবনের সমাপ্তি নয়। বরং জীবনের শুরু। আমাদের গন্তব্য এই নশ্বর পৃথিবীর পরে অসীম সময় ধরে বিস্তৃত। আমাদের প্রতিপালক পার্থিব সকল কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব নিবেন এবং সবার মাঝে তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। অতঃপর কেউ এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ও আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে ধন্য হয়ে সফলতা লাভ করবে। আর কেউ কেউ তাঁর ন্যায় বিচারে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়ে নিকৃষ্ট আবাসস্থল জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে। 

সকল যুগের পশ্চিমা ও প্রাচ্যীয় সকল জাহিলি জীবন ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের ইসলামী জীবন ব্যবস্থা আমাদের জীবনকে একটি অর্থ দেয়, একটা উদ্দেশ্য ও গন্তব্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। একটা মহৎ, সুনিয়ন্ত্রিত ও সুচিন্তিত পরিকল্পনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

আমাদের ইসলামী জীবন দর্শন পার্থিব সর্বোচ্চ সুখ হয়তো নিশ্চিত করতে পারে না, তবে এটি আমাদের সুখে দুঃখে পরম এক প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, আমরা তো একা নই! এই জগৎসমূহের প্রতিপালক আমাদের সাথে আছেন। আমাদের তিনি ভালোবাসেন, তিনি আমাদের এই কষ্ট থেকে শীঘ্রই মুক্তি দেবেন এবং কল্পনাতীত প্রতিদান দিয়ে আমাদেরকে পরম মমতা ও নির্ভরতায় আগলে রাখবেন। আমরাও তাঁকে ভালোবাসি, তাঁর শাস্তিকে ভয় করি, তাঁর অগণিত অনুগ্রহে ডুবে থেকে তাঁরই স্তুতি গাই। জীবনেতিবৃত্তের সব কিছুতেই তাঁর উপরই নির্ভর করি, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি ও তাঁরই সন্তুষ্টিতে আমাদের জীবন নিবেদন করি।

যারা আজকের পৃথিবীতে অন্যায় করছে, নানাভাবে শোষণ করে চলেছে, নিরীহ লোকেদের হত্যা করছে, নির্যাতন করছে, অথচ বড় কর্পোরেশনের মালিক হওয়াতে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় থাকাতে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে, তাদের এই অন্যায় নিপীড়নের কি কোনো বিচার হবে না? যুক্তি কী বলে? আজীবন কেউ শোষণ করবে, হত্যা করবে, নির্যাতন করবে। আর কেউ আজীবন শোষিত হয়ে যাবে। সীমালঙ্ঘনকারীরা, জুলুমবাজরা এমনিতেই ছাড়া পেয়ে যাবে? কখনোই না।

নিশ্চয়ই বিচারের দিনটি নির্ধারিত হয়ে আছে। [সূরাহ আন-নাবা (৭৮):১৭]

আর আমি তো কেবল কিছুকাল একে স্থগিত করে রেখেছি। সূরাহ হুদ (১১):১০৪]

স্রষ্টার আদালতে সেদিন তারা মুখোমুখি হবে। তিনিই সেদিন সবার মাঝে ন্যায়বিচার করবেন।

আল্লাহ্ কি বিচারকদের মধ্যে ন্যায়বিচারে শ্রেষ্ঠ নন? [সূরাহ আত-তীন (৯৫):৮]

তিনি নিজের জন্য জুলুম হারাম করে নিয়েছেন। তাই তাঁর অপরিসীম অনুগ্রহ পেয়ে কেউ সেদিন পরম শান্তির জান্নাতে প্রবেশ করবে। এমন জান্নাত, যার সৌন্দর্য ও মহিমা, শান্তি ও প্রশান্তি, সম্পদ ও সমৃদ্ধি, স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শোনেনি, কোনো মানবহৃদয় কখনো কল্পনা করেনি। যেই জান্নাতের তৃপ্তি ও প্রাপ্তি, সুর ও সুষমা, আনন্দ ও সুখানুভূতি, লাবণ্য ও মাধুর্য বর্ণনা দিতে গিয়ে ভাষা অর্থহীন যায়, শব্দেরা বোবা হয়ে যায়। যেখানে প্রবহমান থাকবে স্বচ্ছ পানির নহরসমূহ। মনিমুক্তোর মতো ছড়ানো তরুণ সেবক, উপচে পড়া পানপাত্র, পবিত্র শরাব, স্বর্ণখচিত সুউচ্চ অট্টালিকা, বিলাসবহুল আসবাবপত্র, নানান ফলমূলে শোভিত বাগান, রাজত্ব, সুস্বাদু খাবার … আর ডাগর নয়না সমবয়স্কা অনিন্দ্যসুন্দরী যুবতী। যার একটা ওড়না আসমান জমিনের সব কিছুর চেয়ে মূল্যবান। যারা হবে জান্নাতবাসীদের পবিত্র স্ত্রী, তাদের প্রশান্তির ঠিকানা, স্বস্তির স্থান। সেখানে তারা যা চাইবে, তা-ই পাবে। আরাম, আয়েশ, স্বর্ণালংকার, রাজত্ব, জৌলুশ, জাঁকজমকপূর্ণ মহল … যা কিছু সুন্দর, আনন্দময়, মনোরম, চিত্তাকর্ষক, মনোহর … সব। তারা সেখানে অভিভূত হবে, কিন্তু উদ্বিগ্ন হবে না; মুগ্ধ হবে, কিন্তু বিচলিত হবে না; বিস্মিত হবে, কিন্তু চিন্তিত হবে না; প্রাণচঞ্চল হবে, কিন্তু হতাশ হবে না; উচ্ছ্বসিত হবে, কিন্তু ক্লান্ত হবে না।

আর দুর্ভাগারা তাঁর ন্যায়বিচার পেয়ে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।

সেখানে তারা যুগের পর যুগ থাকবে। [সূরাহ আন-নাবা (৭৮):২৩]

অত্যন্ত লোমহর্ষক সেই শাস্তিও কেউ কখনো কল্পনা করতে পারে না। আগুনে তাদের শরীরে চামড়াগুলোতে ফোস্কা পড়ে যাবে। সেই ফোস্কা থেকে গলিত রক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ হবে তাদের খাবার। ফুটন্ত গরমপানি হবে তাদের পানীয়। (সূরাহ আন-নাবা, আয়াত ২৫ দ্রষ্টব্য) সেটা পান করার সাথে সাথে তার ঠোঁট পুড়ে যাবে, গলা, পাকস্থলী ঝলসে যাবে। এই শাস্তি ধীরে ধীরে কঠোর থেকে কঠোরতর হবে।

এই জাহান্নামই হলো বিদ্রোহীদের আবাসস্থল। [সূরাহ আন-নাবা (৭৮):২২]

সেখানে তারা কোনো সঙ্গী পাবে না।

এটাই তাদের সমুচিত প্রতিফল। [সূরাহ আন-নাবা (৭৮):২৬]

ভাইয়েরা, বিচারের দিনটি সত্য। জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য। যদি কিছু মিথ্যা হয়ে থাকে সেটা হলো দুনিয়া।

তাই জীবনকে এমন দর্শনে পরিচালনা করবেন না, যার ফলে আপনার পরম গন্তব্য সম্পর্কে আপনি উদাসীন থাকেন। নিজের ইচ্ছেকে, নিজের খেয়ালখুশিকে হুকুমদাতা বানাবেন না। কামনা-বাসনা বা খেয়াল খুশির অনুসরণ থেকে বিরত থাকুন। মন যা চায়, তা-ই করবো; মনে যা আনন্দ দেয়, তা-ই হবে – এই নীতিতে প্রলুব্ধ হবেন না। এটি আপনাকে ধ্বংসের চূড়ায় পৌঁছে দেবে। এরপর মর্মন্তুদ শাস্তির সম্মুখীন করে দেবে।

নিশ্চয় জাহান্নাম ওৎ পেতে আছে। [সূরাহ আন-নাবা (৭৮):২১]

ইচ্ছেগুলোর লাগাম টেনে ধরুন পূর্ণ শক্তি দিয়ে। আর এদেরকে আল্লাহ্‌র কাছে সমর্পণ করুন। আর তাঁর হুকুমের গোলাম হয়ে যান। তাঁর রাসূল ﷺ এর দেখানো পথে জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। সেই মহান সত্ত্বার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, এর প্রতিদান আপনি যা পাবেন তার তুলনায় এই আত্মসমর্পণ, এই ত্যাগ কিছুই না। নিজের স্বাধীন ইচ্ছেটা বিনিয়োগ করুন আল্লাহ্‌র কাছে। আল্লাহ্‌ এর রিটার্ন দেবেন। বহুগুণ, অগণিত গুণ বাড়িয়ে এর প্রতিদান দেবেন। বিশ্বাস করুন। আল্লাহ্‌র সাথে লেনদেন করতে কেন এত বিলম্ব করছেন? কেন এতো অনীহা দেখাচ্ছেন? আল্লাহ্‌ তো নানান অজুহাতে আপনাকে অগণিত নেয়ামত দিতে চাইছেন। আপনি কী ভেবে এইসব দূরে ঠেলে দিচ্ছেন? এখনই ফিরে আসুন। পূর্ণ আনুগত্যে নিজেকে প্রস্তুত করুন। অন্তিম যাত্রায় সফল মানুষদের কাতারে দেখার জন্য। আর যদি সেটা করতে না পারেন, তাহলে নিশ্চিত শাস্তির জন্য প্রস্তুত হোন। ভয়ংকর যে শাস্তি থেকে নিষ্পাপ ফেরেশতারাও আল্লাহর কাছে মুক্তি চায়। মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। আল্লাহ্‌র কসম, আপনি ঘোরতর বিপদে আছেন।

নিশ্চয় জাহান্নাম ওৎ পেতে আছে। [সূরাহ আন-নাবা (৭৮):২১]

মনে রাখবেন, দুঃখে কষ্টে হলেও এই জীবন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আখেরাতের জীবনের শাস্তির বা পুরস্কারের শেষ নেই। পৃথিবীর সীমিত এই লোভ লালসা যেন আপনাকে আখেরাতে কঠোরতম শাস্তির উপযুক্ত না বানিয়ে ফেলে! সাবধান! দুনিয়ার সীমিত আরাম আয়েশের জন্য আখেরাতের অসীম জীবনকে যে হুমকির মুখে ফেলে, তার চেয়ে নির্বোধ আর কে আছে! আল্লাহ্‌! তুমি আমাকে জাহান্নামের আগুনের লেলিহান শিখা থেকে রক্ষা করো। আর যারা এই লেখাটি পড়ছে, তাদেরকেও। আমীন।

লেখক: আব্দুল্লাহ দিদার

শেয়ার করুন

0 comments: