বুধবার, আগস্ট ০৮, ২০১৮

হাইকোর্টের নির্দেশনা উপেক্ষিত আরও পর্যালোচনার তাগিদ


মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞ এবং সড়ক নিরাপত্তা গবেষকরা। তারা বলেন, আইনটিতে বেশ কিছু ভালো বিষয় আছে। কিন্তু সর্বোচ্চ সাজা নির্ধারণের বিষয়টি হতাশ করেছে। প্রকৃতপক্ষে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য সর্বোচ্চ সাজার পরিমাণ দুই বছর না বাড়িয়ে বরং কমানো হয়েছে। তারা জাতীয় সংসদে আইনটি পাসের আগে এসব বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য সংশ্নিষ্টদের তাগিদ দিয়েছেন। 

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন আইনের পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই আইনে সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ উচ্চ আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দেশে সড়ক ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে মূলত ব্রিটিশ আইন 'দ্য বেঙ্গল ভেহিক্যাল রুলস ১৯৪০' অনুসারে। পরে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৪০ সালের এ আইনের অধিকাংশ ধারা অক্ষুণ্ণ রেখে ১৯৮৩ সালে মোটরযান আইন হয়। এ আইনে সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর ছিল। পরে ১৯৮৫ সালের সংশোধনীতে সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর করা হয়। ২০১৪ সালে হাইকোর্টের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালের সংশোধিত আইন উচ্চ আদালত বাতিল ঘোষণা করেন। এর আগে ২০১১ সালেই সরকার যুগোপযোগী একটি সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের জন্য উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলতে থাকে। ২০১৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দেশে যুগোপযোগী একটি সড়ক নিরাপত্তা আইনের দাবি ওঠে সব মহল থেকেই। সে সময় নতুন আইন প্রণয়নের কাজ ত্বরান্বিত হলেও পরবর্তী সময়ে তা আবারও নানা জটিলতায় আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তায় রাজপথে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে এ আইনটির খসড়া দ্রুতগতিতে মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন পায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন যুগোপযোগী করার উদ্যোগ অবশ্যই ভালো। কিন্তু এ আইনে রুট পারমিট দেওয়ার কর্তৃপক্ষ আরটিসিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, সঠিকভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতির মতো বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকেছে। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য সর্বোচ্চ সাজার বিষয়টির ক্ষেত্রেও শুধু 'চালকে'র শাস্তির কথা বলে মালিকদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং সড়ক নিরাপত্তা গবেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান সমকালকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ সাজা কত হলো, সেটা প্রধান বিষয় নয়। সড়কে চালকদের রেষারেষির উৎপত্তিস্থল হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবে থাকা কর্তৃপক্ষ আরটিসি, যারা রুট পারমিট দেয়। ত্রুটিপূর্ণ রুট পারমিট থেকেই সৃষ্টি হয় সড়কে রেষারেষির। নতুন আইনে রুট পারমিটের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে। এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বিআরটিএর পক্ষে এককভাবে যথাযথভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য এ ক্ষেত্রে দক্ষ আউটসোর্সিং ব্যবস্থা রাখার একটা সুপারিশ ছিল, যেটাও নতুন আইনে উপেক্ষিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইনে শুধু চালকের শাস্তির কথা বলে মালিকদের দায়মুক্ত রাখা হয়েছে। এটাও ঠিক নয়। আইনটি সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন হলে সেটা আরও বেশি উপযুক্ত হতো। 

আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সমকালকে বলেন, যে আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য তিন বছরের সাজা নির্ধারিত ছিল, সে আইনটি ২০১৪ সালে জনস্বার্থে একটি রিটের মামলায় বাতিল করেছেন হাইকোর্ট। ফলে তিন বছরের সাজা অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য সাত বছর সাজাও কম হয়ে যায়। রায়ের কপিটি তিনি নিজেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে দিয়ে এসেছিলেন বলেও জানান মনজিল মোরসেদ। 

তিনি বলেন, এ আইনে রাস্তা নির্মাণের ত্রুটিতে দুর্ঘটনা হলে তার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, এটা খুবই ভালো। এ ছাড়া সড়কে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য যেসব শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোও ইতিবাচক। কিন্তু সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরও যেখানে কম হয় বলে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ রয়েছে, সেখানে পাঁচ বছর সাজার বিধান হতাশাজনক। কারণ, প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সাজার পরিমাণ সাত বছরের চেয়েও বেশি করা হবে। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল হক সমকালকে বলেন, এ আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য কেবল চালকের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক নয়, মালিক দায়ী হতে পারে, বিআরটিএ দায়ী হতে পারে। মালিকের অতিরিক্ত মুনাফার জন্য চালক বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে বাধ্য হতে পারে। গাড়ির পুরনো যন্ত্রাংশ মালিক সময়মতো পরিবর্তন না করার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিআরটিএ যথাযথভাবে ফিটনেস সার্টিফিকেট না দেওয়ার কারণে দুর্ঘটনা হতে পারে। এ কারণে 'চালকের' পরিবর্তে 'দায়ী ব্যক্তি' উল্লেখ করলে সেটা সার্বজনীন আইন হতো। তার মতে, শুধু চালকের ওপর দোষ চাপিয়ে দায়ী অন্যদের দায়ের বাইরে রাখলে সে আইন থেকে প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলে সেটার একটা যথাযথ তদন্ত হলে, এর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা গেলে সত্যিকারের দায়ী ব্যক্তিকেও চিহ্নিত করা যাবে। এ কারণে একটি নিরপেক্ষ ও বিশেষায়িত অনুসন্ধানী টিম গঠনের বিষয়টিও আইনে থাকা উচিত। তিনি আরও বলেন, আইনে বেশ কিছু নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে। এগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি আশা করেন, সংসদীয় কমিটিতে এ বিষয়গুলোর প্রতি নজর দেওয়া হবে। 

নিরাপদ সড়ক চাই-এর প্রধান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আইনে সর্বোচ্চ সাজার কথা বলা হলেও সর্বনিম্ন সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে এ আইনে শাস্তি নগণ্য হওয়ার ফাঁক থেকে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বারবার বলা হয়েছে, এ আইনট হওয়া উচিত সড়ক নিরাপত্তা আইন। কিন্তু তা না করে করা হলো সড়ক পরিবহন আইন। ফলে ২৫ বছর ধরে সড়ক নিরাপত্তার জন্য তিনি যেসব যুক্তি ও প্রস্তাবনা দিয়ে আসছিলেন, তার প্রতিফলন যেমন হয়নি, শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতিফলনও ঘটেনি। 

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, এ আইন প্রণয়নে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইনটি আধুনিক এবং যুগোপযোগী। এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে তা সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও বলেন, বিএনপির সময়ে এই সড়ক পরিবহন আইন যুগোপযোগী করা হয়নি। বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে এটাও বোঝা যায়, তারা আইন বোঝেন না।

শেয়ার করুন

0 comments: