বুধবার, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৮

সড়কে জিম্মি মানুষ


রাজধানীর নবাবপুরে ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা করতেন গোপালগঞ্জের জানে আলম গাজী (৩০)। রোববার ব্যবসায়িক কাজে মিরপুরে যান তিনি। সেখান থেকে ‌‌‍‌‌‌‘পাঠাও’-এর মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন।

রাত ১০টার দিকে মতিঝিলে তাকে বহনকারী মোটরসাইকেলটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় একটি কাভার্ড ভ্যান। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় জানে আলম ও তাকে বহনকারী মোটরসাইকেলের চালক রিপন সিকদারের। সোমবার জানে আলম গাজীর ভাই নূরে আলম ঢামেক মর্গে ভাইয়ের মৃত্যুতে আক্ষেপ করে বলেন, রাস্তার গাড়িগুলো গাড়ি নয়, একেকটা দানব। আর চালকগুলো নিষ্ঠুর...।

মানুষের জীবন যেন এসব গাড়ির চাকায় জিম্মি। তিনি বলেন, ‘দোকান থেকে বের হয়ে গেল আমার তরতাজা ভাই, আর ফিরল রক্তাক্ত নিথর হয়ে। এদেশে কোনো মানুষের জীবনের গ্যারান্টি নেই। সন্ত্রাসের চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে সড়ক সন্ত্রাস। যে সন্ত্রাসের বিচার নেই।’

শুধু এ ঘটনাই নয়, রোববার বিকালে মিরপুরের শাহ আলী থানার রাইনখোলায় বাসের চাকায় পিষে হত্যা করা হয় রূপনগর থানার এসআই উত্তম কুমার সরকারকে (৩৪)। এছাড়া এদিন ভোরে রাজধানীর বিমানবন্দর গোলচত্বর এলাকায় ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা গাড়িচাপায় তার মৃত্যু হয়েছে। এদিন ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হন আরও তিনজন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের ইনচার্জ সেকান্দর আলী যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিন দুর্ঘটনার কারণে ৬-৭টি লাশ আসে ঢামেক মর্গে। কারও পরিচয় মিলে, কারও পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে যায়। যাদের পরিচয় মেলে না, তাদের লাশগুলো দু-চারদিন রেখে, পরে দাফনের জন্য আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এভাবে অনেকেরই নাম-পরিচয় মুছে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গ ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গেও প্রতিদিন একই সংখ্যক লাশ আসে।

শাহবাগ মোড়ে সোমবার কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শাহ আলম সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, সায়েন্স ল্যাব থেকে রিকশায় করে শাহবাগ আসছিলাম। কাঁটাবন এলাকায় আসতেই পেছন থেকে একটি বাস আমাকে বহনকারী রিকশাকে চাপা দেয়। তবে অল্পের জন্য বেঁচে যাই আমি। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও এভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে। আর মরছে মানুষ।

অ্যাপসভিত্তিক মোটরসাইকেল সেবায় কাজ করেন আবদুল করিম বলেন, ‘সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থেকে যাত্রী বহন করি। সড়কের কেউ নিয়ম মানেন না। যেন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। কখন যে বাস কিংবা ট্রাক এসে মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয় তা বোঝা মুশকিল। এই যে বাসা থেকে বের হয়েছি, আবার সুস্থদেহে ফিরতে পারব কিনা এর কোনো গ্যারান্টি নেই।’

চানখাঁরপুলে কথা হয় পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী আজিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বোধহয় বেঁচে থাকতে হলে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করতে হবে। অথচ জীবন চলতে হলে ঘর থেকে বের না হওয়ার উপায় নেই। আশঙ্কা নিয়েই মানুষকে ঘর থেকে বের হতে হয়। তিনি বলেন, আমরা তো এখন সভ্য যুগে বসবাস করছি। জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেচনায় মানুষ অনেক বেশি এগিয়েছে। রাস্তাঘাটও উন্নত এবং প্রশস্ত।

তারপরও এত দুর্ঘটনা! সুস্থ মাথায় গাড়ি চালালে তো এত দুর্ঘটনা হওয়ার কথা নয়। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই) এক সমীক্ষা বলছে, বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা, মোটরসাইকেলের অতিরিক্ত গতি ও হেলমেট ব্যবহার না করা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে বাস ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের হার ৭০ শতাংশ।

আর ট্রাফিক আইন না মেনে রাস্তা পারাপার হওয়ার সময় হতাহতের হার ৩০ শতাংশ। শুধু রাজধানীতে ঘটা এসব দুর্ঘটনায় বছরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২৬৭। এতে মারা যায় ২৮০ জন। আহত হয় ৩৫৯ জন। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে ১২৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হয় ১৪১ জন। আহতের সংখ্যা ৩৩৭। পুলিশের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, দেশের অন্য সব মহানগরের চেয়ে শুধু ঢাকা মহানগরে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এর কারণ ঢাকায় মানুষ ও যানবাহন দুটোই বেশি।

যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, ঈদুল আজহার আগে ও পরে ১৩ দিনে দেশের বিভিন্ন সড়কে ২৩৭টি দুর্ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত ও ৯৬০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া চলতি বছরে (জুলাই পর্যন্ত) দেশে ২ হাজার ৩৫৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৪৭১ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩১৭ জন নারী ও ৩২৬টি শিশু।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিচার্স ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, রাজধানীর গণপরিবহনকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আনলে সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ কমবে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হচ্ছে- পথচারীদের হাঁটার জন্য ফুটপাতে নির্দিষ্ট পরিমাণে সোল্ডার না থাকা, পর্যাপ্ত পরিমাণ ফুটওভারব্রিজ না থাকা, জেব্রাক্রসিংয়ের মার্কিং উঠে যাওয়া, ব্যক্তিগত সচেতনতার অভাব, যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়ার অভ্যাস এবং ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়া। এসব কারণে পথচারীরা ফুটপাত থেকে ক্রমান্বয়ে রাস্তার দিকে ধাবিত হয়। এ কারণে তারা দুর্ঘটনার শিকার হয়।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যে অ্যাকসিডেন্টগুলো হয় তার মধ্যে পেছন থেকে একটা গাড়ি আর একটাকে ধাক্কা মারার হার ২০%। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় ৮%। গাড়ি পাশাপাশি ঘষা লাগে ৬%। উল্টে যায় ২%। পার্কিং করা গাড়িকে ধাক্কা দেয় ২%। ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে অ্যাকসিডেন্ট ঘটে ৩%। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ লোক মারা যায় তার মধ্যে ৪৭% পথচারী। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই পথচারী অ্যাকসিডেন্টের পরিমাণ ৪৯ শতাংশ।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর মতে, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে মানুষের মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। ঢাকা শহরে বেশির ভাগ পথচারীই দুর্ঘটনার শিকার হন।

পথে পথে মৃত্যু প্রতিরোধে গণপরিবহনকে শৃঙ্খলায় আনাটা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, চালকদের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ বা গাইডলাইন নেই। ঢাকা সিটিতে ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চলতে দেখা যায়। এগুলোর অধিকাংশ চালকই শিক্ষিত। অথচ তারা কোনো আইনের তোয়াক্কা করে না। যেটা পথচারীদের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আমরা যারা সচেতনতা নিয়ে কথা বলছি সেই আমরাই রাস্তার কোনো নিয়ম-কানুন মানছি না। সেখানে দুর্ঘটনা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ট্রাফিক ঢাকা মহানগর উত্তর বিভাগের ডিসি প্রবীর কুমার রায় বলেন, পথচারীরা যদি একটু নিয়ম মেনে চলেন। চালকরা যদি নিয়ম মেনে চলেন, তবে অবস্থার উন্নতি হবে। তিনি বলেন, দেখা গেছে, পথচারীরা ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে যানবাহনের নিচে পড়েন। অনেকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন যানবাহনের চাপ হালকা হওয়ার অপেক্ষায়। একটু ফাঁক পেলেই তারা ছুট দেন। এতে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। আন্ডারপাস, ওভারব্রিজ থাকলেও পথচারীরা এসব খুব কমই ব্যবহার করেন।

শেয়ার করুন

0 comments: