রবিবার, এপ্রিল ২৬, ২০২০

ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ


ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের বিরুদ্ধে মুমূর্ষু রোগীর লাইফসাপোর্ট খুলে ছাড়পত্র ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।


এই অভিযোগ করেছেন বিশ্ব ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জিয়া হায়দার; তিনি বলেছেন, কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর তার মায়ের ক্ষেত্রে এই কাজটি করেছে বেসরকারি এই হাসপাতালটি।পরে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ভর্তি করা হয় জিয়ার মাকে। গত ২৩ এপ্রিল সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে।
ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এ বিষয়ে তাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। তবে ‘কোভিড হাসপাতাল’ না হওয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিংবা আক্রান্ত ’সন্দেহ’ রোগীকে তারা রাখে না।

ডা. জিয়া হায়দার রোববার এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে তার মায়ের মৃত্যুর ঘটনা সবিস্তারে তুলে ধরে ইউনাইটেড হাসপাতালকে দোষারোপ করেন।

তিনি বলেন, গত ৫ এপ্রিল ‘মারাত্মক নিউমোনিয়া’ দেখা দেওয়ার পর পরবর্তী ছয় দিন উত্তরার বাড়িতেই চিকিৎসা হচ্ছিল তার মায়ের। সেখানে তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী এবং বোন জামাই মিলে তিনজন চিকিৎসক ছিলেন।

”কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের ফলে হাসপাতালগুলো ডাক্তারসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সীমিত রাখায়, আমার ভাইবোনেরা বাড়িতেই যতটা সম্ভব চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল। তবে, ১১ এপ্রিল রক্তে অক্সিজেন স্যাচুরেশান কমে যেতে শুরু করায়, তার চিকিৎসা আর বাড়িতে রেখে করা সম্ভবপর হয়নি।”

পরবর্তীতে ঢাকার অ্যাপোলোসহ কয়েকটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও কেউই কোভিড-১৯ পরীক্ষার সনদপত্র ছাড়া রোগী ভর্তি নিতে রাজি হননি বলে জানান জিয়া হায়দার।

তখন উত্তরার পরিচিত একটি ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয় জিয়া হায়দারের মাকে। সেখানে তাকে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর আইইডিসিআর থেকে করোনাভাইরাস পরীক্ষায় ফল ‘নেগেটিভ’ আসে বলে জানান জিয়া।

“এই ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই উন্নততর চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ১২ই এপ্রিল মধ্যরাতে আম্মাকে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয় এবং ইন্টিউবেটেড ভেন্টিলেশানে সংযুক্ত করা হয়।”

সে সময় ১০০% অক্সিজেন চাপে রোগীর রক্তের অক্সিজেন স্যাচুরেশান প্রায় ৯০% বজায় থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, “এই স্তরের নিচের অক্সিজেন স্যাচুরেশান বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়। মূলত আম্মা লাইফ-সাপোর্টে ছিলেন।“

জিয়া হায়দার বলেন, “পরিতাপের বিষয় এই যে, ১৪ই এপ্রিল ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে আমার ভাইদের ডেকে জানানো হয় যে আম্মার কোভিড-১৯ পরীক্ষার পরবর্তী (দ্বিতীয়) ফলাফল পজিটিভ আসায় তাকে অনতিবিলম্বে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

“এটা অবিশ্বাস্য যে, ইউনাইটেড হাসপাতালের মতো একটি খ্যাতনামা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কী করে লাইফ-সাপোর্টে থাকা একজন মুমুর্ষূ রোগীকে ছাড়পত্র দিতে পারে, যেখানে তাদের অজানা থাকার কথা নয় যে, এই রোগীটির ভেন্টিলেশান সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে তার জীবন সংশয় হবে, বা মস্তিষ্কের অপূরণীয় ক্ষতি হবে, কিংবা তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।”

তার মাকে পৃথক কাঁচঘেরা যে কক্ষে রেখে ভেন্টিলেশান সংযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে অন্য রোগীদের সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা এড়িয়ে সেবা দেওয়া যেত বলেই মনে করছেন সুইডেনের উমিয়্য ইউনিভার্সিটি থেকে রোগতত্বে পিএইচডি-ডিগ্রিধারী জিয়া হায়দার।

তার ভাই, বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনদের সব ধরনের অনুরোধ উপেক্ষা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় দুই লাখ টাকা বিল পরিশোধ সাপেক্ষে তার মাকে ছাড়িয়ে দেয়।


“এটা জেনেও যে ভেন্টিলেশানের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ ছাড়া তিনি বাঁচবেন না।”

এরপর আইসিইউ সুবিধা সম্বলিত একটি অ্যাম্বুলেন্সের অনুরোধ করা হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিযোগ করেন জিয়া। পরে নিজেরা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে তার মাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২৩ এপ্রিল তার মায়ের মৃত্যু হয়।

ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে থেকে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়ার পথে ‘মূল ক্ষতি’ হয়েছিল অভিযোগ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “কারণ ৭৫ বছর বয়সী লাইফ-সাপোর্টে থাকা একজন রোগীকে আনা-নেওয়ার পথে দীর্ঘ একঘণ্টা সময় ধরে ভেন্টিলেশানের অক্সিজেন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছিল।”

“ইউনাইটেড হাসপাতাল যেভাবে লাইফ-সাপোর্টে থাকা একজন রোগীকে ছাড়িয়ে নিতে বাধ্য করেছিল, তা নজিরবিহীন, অনৈতিক, এবং বেআইনী। আমরা এই বেআইনী এবং চরম অমানবিক কাজের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আপনাদের সমর্থন চাই,” লিখেছেন জিয়া।

যা বলল ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ
“আমরা এখনও পর্যন্ত কোনো রোগীর কাছ থেকে এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি, আমরা আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ পাইনি কোনো রোগীর কাছ থেকে। এখন সে যদি তার ফেইসবুকে তার ব্যক্তিগত ক্ষোভের কথা লিখে থাকে, তিনি লিখতেই পারেন, সেটার ভিত্তিতে আরও পাঁচ জন যদি যোগাযোগ করেন, সেটার উত্তর তো আমি দেব না। কারণ আমাকে রোগীর স্বজন বা পরিবারে পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “রোগী কে, কখন-না জেনে আমি তদন্ত করতে পারব না। রোগী সম্পর্কে জানতে হবে। রোগীর পরিচয় না দিয়ে যদি ঘটনার বর্ণনা দেয়, তাহলে তার ভিত্তিতে তো অনুসন্ধান করা সম্ভব না। কেউ যদি রোগীর পরিচয় সম্পর্কে জানিয়েও থাকে, তাহলে সেটার উত্তর আমি আপনাকে দেব না। রোগীর স্বজনকে দেব।”

কোভিড-১৯ রোগীর বিষয়ে হাসপাতালের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সাগুফা আনোয়ার বলেন, “আমরা বহুবার বহুবার, বহু জায়গায় বলেছি, কোভিড আক্রান্ত রোগীকে কেউ রাখতে পারবে না, সরকার নির্ধারিত হাসপাতাল ব্যতিত। কোভিড রোগীদের রাখার জন্য সরকার নির্ধারিত হাসপাতাল আছে।

“কোভিড আক্রান্ত কোনো রোগী যদি আসে, যদি সন্দেহ হয়, রোগীকে কোভিড নির্ধারিত হাসপাতালেই পাঠাব। আমরা সামনেও তাই করব, কারণ আমরা কোভিড হাসপাতাল না।”

কোভডি রোগী রাখার ঝুঁকি তুলে ধরে ডা. সাগুফা বলেন, “কোভিড এবং নন কোভিড রোগীকে আলাদা করে রাখতে হবে। আমাদের হাসপাতালে দুইটা বা তিনটা বিল্ডিং নাই যে এক বিল্ডিংয়ে কোভিড ও আরেক বিল্ডিংয়ে নন কোভিড রোগী রাখব।

“আমরা বিভিন্ন জায়গায় বারেবারে একই কথা বলছি, আমরা কোভিড হাসপাতাল না। আমাদের এখানে হার্টের, কিডনির, ক্যান্সারের অনেক রোগী আছে, যাদের ইমিউনিটি কম্প্রোমাইডজ। আমরা কোভিড রোগীকে হাসপাতালে রাখতে পারছি না। এটা নিয়ে প্রশ্নের আর অবকাশ নেই।”

শেয়ার করুন

0 comments: