বৃহস্পতিবার, মে ০৭, ২০২০

লকডাউন শিথিলে বদলে যাচ্ছে দেশ

আগামী ১০ মে থেকে শর্তসাপেক্ষে দোকানপাট খোলার কথা ছিল। সেদিন পর্যন্ত কেউ অপেক্ষা করেনি। কাঁচাবাজার শুধু নয়, অনেক দোকানপাটও ইতিমধ্যে চালু হয়ে গেছে। বেশকিছু মার্কেটের সামনে ভিড় বেড়েছে। চেনা রাজধানী এক মাস অচেনা হয়ে পড়েছিল। ছিল না কোন যানজট। গত দু’দিন থেকে রাস্তায় যানজট বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি নেই। এ সব পরিস্থিতি দেখে অনেকেরই অভিমত হচ্ছে, যেন সরকারি ঘোষণার আগেই বাইরে আসতে সবাই প্রস্তুতি নিয়ে বসে ছিলেন। আর এসব কারণে হঠাৎ করেই বদলে গেছে দেশের চেহারা। ছুটি বা লকডাউন অনেকটা অদৃশ্য। গণপরিহন ছাড়া এখন সব ধরনের যানবাহন রাস্তায় বের হয়েছে। সচল হয়েছে আরিচা ফেরিঘাট। শত শত মানুষ গাদাগাদি করে ঢাকামুখী হচ্ছেন।

আবার ঢাকার এই বেসামাল পরিস্থিতি দেখে বড় বড় সুপার মলের ব্যবসায়ীরা বেশ শঙ্কিত। তারা আলাদভাবে বৈঠক করে তাদের ব্যবসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত পাকা করেছেন। গতকাল এক ঘোষণায় বসুন্ধরা, যমুনা ফিউচার পার্ক, ঢাকা নিউমার্কেটসহ বেশ কয়েকটি শপিং মল কর্তৃপক্ষ তাদের এই অভিমতের কথা জানিয়ে দিয়েছেন।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে দোকানপাট ও শপিংমল খোলার সিদ্ধান্ত জানিয়ে গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে আগামী ১০ মে থেকে শপিংমল ও দোকানপাট খোলা যাবে। তবে তা বিকেল ৪টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।
এদিকে সবকিছু ঠিক থাকলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামী ১৭ মে থেকে সীমিত আকারে দেশে গণপরিবহন চালু হচ্ছে বলে আভাস দিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন। তবে ঈদের সময় চারদিন গণপরিবহন সম্পূর্ণভাবে তা বন্ধ থাকবে বলেও জানান তিনি। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন এসব কথা জানিয়েছেন গতকাল। তবে বাস, ট্রেন, নৌ কর্তৃপক্ষ এখনো এ বিষয়ে জানে না। প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, জীবিকার তাগিদে একটু একটু করে সবই চালু করতে হবে। তবে তা স্বাস্থ্যবিধি মেনে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন কিভাবে চলবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ৪০ সিটের গাড়ি ২০ সিট পরিপূর্ণ হবে। অর্থাৎ এক আসন ফাঁকা রেখে মানুষকে বসাতে হবে। গাড়িতে উঠার আগে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে দিতে হবে। জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে।
সমালোচনায় মুখর ১৪ দলের শরিকরাও
আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে আগামী ১০ মে থেকে শপিংমল ও দোকানপাট খুলে দেয়া হবে বলে সরকারিভাবে যে ঘোষণা এসেছে, তার তীব্র সমালোচনা করেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট ১৪ দলের শরিকরা। তারা বলেছে, সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে, তা হবে ‘তীরে এসে তরী ডোবানো’র মতো। বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ই বলে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এবারের ঈদে আনন্দ নয়, মানুষকে বাঁচানো ও রক্ষা করা জরুরি।
এ বিষয়ে ১৪ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, এক ঈদে ব্যবসা করতে না পারলে শপিংমলগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে না। বরং যেটা প্রয়োজন তা হলো ছোট ব্যবসা, শিল্প, কৃষি, খামার ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্রদান। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন সেটাকে এই দিকে বিস্তৃত করা যুক্তিযুক্ত হবে। তিনি বলেন, ‘লকডাউন’ শিথিল করার সরকারি ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এটা হবে তীরে এসে তরী ডোবার শামিল। অবিবেচনাপ্রসূত ও আত্মঘাতী। করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতিকে সচল করার যে যুক্তি আনা হচ্ছে তা-ও গ্রহণযোগ্য নয়। করোনাভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ‘দি ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা সে রকমই বলেছে। সরকার ও অর্থমন্ত্রী নিজেও এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী এবং আগামী বছরের জন্য চলতি বছরের চাইতেও বড় বাজেট করতে চলেছেন। বিশ্বেও এমন পরিস্থিতি হয়নি যে পোশাকশিল্প তার বাজার হারাবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এরকম পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে শপিংমল ও দোকানপাট খুলে দিয়ে জনসমাগমের সুযোগ দেয়া হবে আত্মঘাতী। এবারের ঈদ আনন্দের ঈদ নয়, শপিংয়ের ঈদ নয়। দেশের এই সংকটেও যাদের শপিংয়ের সামর্থ্য আছে তাদের শপিংয়ের অর্থ দিয়ে শপিং না করে কর্মহীন, আয়হীন, নিরূপায় ও অসহায় মানুষের পাশে খাদ্য সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতে হবে। তাহলে কর্মহীন, আয়হীন, নিরূপায় ও অসহায় মানুষরা ঈদের দিন দুই বেলা পেটভরে খেতে পারবে, সেটাই হবে এবারের ঈদের সবচেয়ে আনন্দ। হাসানুল হক ইনু ঈদকে সামনে রেখে ১০ মে থেকে ঢালাওভাবে শপিংমল, দোকানপাট খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বসুন্ধরার পর এবার ঈদে খুলবে না যমুনা ফিউচার পার্ক
শর্ত সাপেক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শপিংমল আগামী ১০মে থেকে সীমিত আকারে খোলার অনুমতি দিলেও করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে ঢাকার বড় বড় বিপনীগুলো করোনা দূর্যোগের সময় এ সব বিপনী বিতান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঢাকার সুপারমল বসুন্ধরা, যমুনি ফিউচার পার্ক, ঢাকা নিউমার্কেটসহ নামীদামী মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ীরা ঈদের আগে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তাদের ব্যবসা চালু করতে চাচ্ছেন না। গতকাল বসুন্ধরা ও যমুনা ফিউচার পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, চলমান পরিস্থিতি উন্নতি না হলে জনস্বাস্থ্যে কথা বিবেচনায় তাদের শপিং মল খোলা হবে না।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে করোনায় মোট ১৮৬ জনের মৃত্যু হলো। গত পরশুর তুলনায় করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। একদিনে শনাক্তের সংখ্যা গতকালই সর্বোচ্চ ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৯০ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১১ হাজার ৭১৯ জন। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের স্থান এখন ৩৭তম। ঢাকা মেডিকেল কলেজের করোনা ইউনিটে গত চার দিনে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল। বাকিরা করোনা ভাইরাস নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, গত চার দিনে ৩০২ জন রোগী ভর্তি হন। এদের মধ্যে ৫৫ জনের করোনা পজিটিভ। ৭ জনের অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক আক্রান্ত হওয়ায় ফাঁড়িটি লকডাউন করা হয়েছে। শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী থেকে শুরু করে অনেক কর্মকর্তা করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন। এই সময়ে পুলিশ ও স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন বেশী। গত মঙ্গলবারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১১৫০ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন পাঁচ জন। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১২০০ জন। এর মধ্যে চিকিৎসক ৫৭৪ জন। মারা গেছেন ২ জন।

শেয়ার করুন

0 comments: